১৬২ বছরের রেকর্ড ভাঙতে যাচ্ছে দেশের চা শিল্প

shohag
By shohag January 20, 2017 17:02

১৬২ বছরের রেকর্ড ভাঙতে যাচ্ছে দেশের চা শিল্প

বিশেষ প্রতিনিধি: উৎপাদনে সর্বোচ্চ রেকর্ড গড়তে যাচ্ছে দেশের চাশিল্প। এবারের মৌসুম শেষে চা উৎপাদনে সর্বকালের সর্বোচ্চ রেকর্ড সৃষ্টির ধারণা ক্রমেই বাস্তব রূপ লাভ করছে। চলতি অর্থবছরের শেষ পর্যন্ত চা উৎপাদনের এ ধারা ঠিক থাকলে তা হবে গত ১৬২ বছরে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চা উৎপাদনের রেকর্ড। গত বছর দেশে চায়ের বাম্পার উৎপাদন হয়েছে। যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও অধিক। বর্তমানে চা রপ্তানিতে বাংলাদেশ অষ্টম। জিডিপিতে এর অবদান শূন্য দশমিক ৮১ শতাংশ।tree

জানা গেছে, দেশে বর্তমানে চায়ের প্রায় সোয়া ২ হাজার কোটি টাকার বাজার রয়েছে। ২০১৬ সালে সারা দেশে ৮ কোটি ৫০ লাখ কেজি চা উৎপাদন হয়েছে। যা গত ২০১৫ সালের চেয়ে ১ কোটি ৭৮ লাখ ১০ হাজার কেজি বেশি। যা আগের সব ভেঙে দিয়েছে। দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে চায়ের চাহিদা রয়েছে প্রায় ৭ কোটি কেজি। ২০১৪ সালে উৎপাদন কিছুটা কমে ৬ কোটি ৩৮ লাখ ৬০ হাজার কেজি, ২০১৩ সালে ৬ কোটি ৫২ লাখ ৬০ হাজার কেজি চা উৎপাদন হয়। ২০১২ সালে ৬ কোটি ১৯ লাখ ৩০ হাজার, ২০১০ সালে ৬ কোটি ৪ লাখ কেজি, ২০০৯ সালে ৫ কোটি ৯৯ লাখ ৯০ হাজার, ২০০৮ সালে ৫ কোটি ৮৬ লাখ ৬০ হাজার, ২০০৭ সালে ৫ কোটি ৮৪ লাখ ২০ হাজার কেজি। ২০০৬ সালে উৎপাদন ৫ কোটি ৩৪ লাখ ৭০ হাজার কেজি, ২০০৫ সালে দেশে চা উৎপাদন হয় ৬ কোটি ১ লাখ ৪০ হাজার কেজি। ২০১৬ সালে ১ কোটি ৪৩ লাখ কেজি চা-পাতা আমদানি করা হয়। ২০১৫ সালে চা আমদানি করা হয়েছে ১ কোটি ৫০ লাখ কেজি। ২০১৪ সালে আমদানি করা হয়েছিল প্রায় ৬১ লাখ কেজি চা। ২০১৩ সালে বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয়েছে ১৯ কোটি ৫২ লাখ টাকার চা।

এ প্রসঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন বলেন, একসময় চা রপ্তানিতে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল বাংলাদেশ। চায়ের হারানো গৌরব ও ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে কাজ করছে বর্তমান সরকার। ভবিষ্যতে চা শিল্পের বিকাশ এবং রপ্তানি বাড়াতে একটি পথ-নকশা তৈরি করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। শিগগিরই পথ-নকশাটি প্রকাশ করা হবে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ চা বোর্ডের গবেষণা কর্মকর্তা জাফর উল্লা চৌধুরী প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, চা রপ্তানিতে বাংলাদেশ এখন অষ্টম। আরো এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, দেশে প্রথমবারের মতো চা উৎসব আয়োজন করা হয়েছে। চা শিল্পের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে এ মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছে সরকার। আশা করা হচ্ছে, চা শিল্প তার হারানো ঐতিহ্য ফিরে পাবে।

বাংলাদেশ চা বোর্ডের চা বাগান ব্যবস্থাপনা সেলের মহাব্যবস্থাপক মো. শাহাজান আখন্দ বলেন, চা শিল্পের জন্য নেওয়া কৌশলগত পরিকল্পনা ‘ভিশন-২০২১ বাস্তবায়ন হলে দেশে চা উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়াবে ১০ কোটি কেজি। আর ভিশন-২০২১ বাস্তবায়িত হলে ২ কোটি কেজি চা রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হবে। অবশিষ্ট ৮ কোটি কেজি চা দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে পারবে।

জানা গেছে, বর্তমানে হেক্টর প্রতি চা এবং জাতীয় গড় উৎপাদন ১২৭০ কেজি এবং চা চাষে জমির গড় ব্যবহার মাত্র ৫১ দশমিক ৪২ শতাংশ। বাংলাদেশে চায়ের উৎপাদন বছরে প্রায় ৬০০ মিলিয়ন কেজি। চা উৎপাদনের দিক থেকে এগিয়ে আছে চীন, ভারত, কেনিয়া ও শ্রীলঙ্কা। এ তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান অষ্টম। চা একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল ও রপ্তানি পণ্য। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে প্রতি বছর ৫০ লাখ কেজি চা রপ্তানি হয়ে থাকে। তবে আধুনিক প্রযুক্তির সমাহারে ভারত, মালয়েশিয়া, কেনিয়া, শ্রীলঙ্কার মতো বিভিন্ন চা উৎপাদনকারী দেশ চা শিল্প অনেক দূর এগিয়ে গেছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কিছুটা পিছিয়ে। বিশ্বজুড়ে ক্রেতারা চায়ের রঙ, ঘ্রাণ ও স্বাদÑ এই তিনটি বিষয়ে গুণগত মান উন্নত করার ওপরই জোরালো তাগিদ দিয়ে থাকে। এ বিষয়গুলোর দিকে নজর দিলেই আরো বেশি করে তৈরি হবে এই শিল্পের অপার সম্ভাবনা।জানা গেছে, বর্তমানে দেশে চা বাগানের সংখ্যা ১৬৭টি। তার মধ্যে সিলেট জেলায় ২০টি, মৌলভীবাজার জেলায় ৯৩টি, হবিগঞ্জে ২২টি, চট্টগ্রামে ২৩টি, পঞ্চগড়ে ৭টি, রাঙামাটিতে ১টি এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১টি বাগান রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ২০টি বাগান আছে ব্রিটিশদের। দেশীয় মালিকানাধীন বাগানের সংখ্যা ১৩১টি, আর সরকার পরিচালিত বাগানের সংখ্যা ১৬টি। এতে চা চাষের জন্য জমি রয়েছে প্রায় এক লাখ ১৫ হাজার হেক্টর। বর্তমানে দেশে ৫২ হাজার ৩১৭ হেক্টর জমিতে চা চাষ করা হচ্ছে। চা প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য দেশে চা প্রক্রিয়াজাতকারী কারখানার সংখ্যা এখন ১১৪টি। চা বাগানগুলোতে বর্তমানে স্থায়ীভাবে কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৯০ হাজার। এর মধ্যে শতে ৭৫ শতাংশ নারী শ্রমিক। অস্থায়ীভাবে নিয়োজিত আছে আরো ৩০ হাজার শ্রমিক। তবে চা শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সাড়ে ৩ লাখ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৭ লাখ মানুষ জড়িত।সূত্র আরো জানিয়েছে, চায়ের অভ্যন্তরীণ চাহিদা প্রতিদিনই বাড়ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারকে বিবেচনায় নিলে ২০২৫ সাল নাগাদ চায়ের মোট চাহিদা দাঁড়াবে ১২৯ দশমিক ৪৩ মিলিয়ন কেজি এবং বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ওই সময়ে চায়ের উৎপাদন হবে মাত্র ৮৫ দশমিক ৫৯ মিলিয়ন কেজি। এদিকে চা শিল্প উন্নয়নে ‘উন্নয়নের পথ নকশা’ শিল্প শীর্ষক একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৯৬৭ কোটি টাকা ৩৫ লাখ টাকা। এ পরিকল্পনায় চায়ের অতীত ইতিহাস ধরে রাখতে ও গড় ব্যবহার বাড়াতে সারা দেশের ১৬২টি চা বাগান থেকে ১১ কোটি কেজি চা উৎপাদনের পরিকল্পনা সরকারের। এ জন্যে ১০টি লক্ষ্য পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় একটি সূত্র জানিয়েছে।

 

shohag
By shohag January 20, 2017 17:02