ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও শিল্পায়নে সরকারের ভূমিকা

Kushtiar Diganta
By Kushtiar Diganta February 12, 2017 13:20

ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও শিল্পায়নে সরকারের ভূমিকা

         মোঃ রাশেদ খান
ভূমিকাঃ বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সাংবিধানিক ও ব্যবসায় বাণিজ্যের উন্নয়নের ইতিহাস অনেক পুরনো। সেই ১৪৯৮ সালের কথা। ইতিহাস ও অর্থনিীতির গবেষক-বিশ্লেষক বহু গ্রš’ প্রণেতা সুলেখক ডঃ মুহাম্মাদ নুরুল ইসলাম তাঁর “ব্রিটিশ ভারতে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক উন্নয়ন” গ্রšে’ লিখেছেন, পঞ্চদশ শতকের শেষভাগে পর্তুগিজদেশীয় ভাস্কো-দা-গামা দক্ষিণ আফ্রিকার মুসলিম নাবিক আহমদ ইবনে আব্দুল মজিদের সহায়তায় ১৪৯৮ সালের ২৭ মে আফ্রিকার পশ্চিম-পূর্ব উপকূল ঘুরে বরাবর সমূদ্রপথে ভারতবর্ষে আসার পথ আবিষ্কার করেন এবং কালিকট বন্দরে উপনীত হন। পর্তুগীজদের ভারতে আগমন সর্বপ্রথম জলপথে ভারত আক্রমণের উদাহরণ স্বরূপ। ভাস্কো-দা-গামার সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে পরবর্তী দুই বছরের (১৫০০ সাল) মধ্যেই পেড্্েরা আলভারেজ কাব্রাল নামের নাবিকের নেতৃত্বে ১৩ টি জাহাজ, ১২০০ পর্তুগীজ এবং প্রচুর পরিমাণ বাণিজ্য পণ্য নিয়ে কালিকট অভিমুখে যাত্রা করেন একটি বণিক গোষ্ঠী। এটিই পর্তুগাল হতে দ্বিতীয় বাণিজ্য অভিযান। আলভারেজ কালিকটে পৌঁছেই কালিকটের রাজা জামোরিনের শত্রুতে পরিণত হন। কালিকট বন্দরে ঐ সময়ে অসংখ্য আরব বণিক বাণিজ্য ব্যাপদেশে যাতায়াত করত। ব¯‘ত কালিকট বন্দরের সমৃদ্ধি আরব বণিকগণের সহিত বাণিজ্যের ফলেই গড়ে উঠেছিল। কিš‘ আলভারেজ কালিকট বন্দর হতে আরব বণিকদের বিতাড়িত করতে উদ্যত হলে স্বভাবতই আলভারেজ-জামোরিনের সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে ওঠে। ঐ সময় হতেই পর্তুগীজ বনিকগণ বাণিজ্যনীতির সাথে সাথে দক্ষিণ ভারতীয় রাজনীতিতেও অংশগ্রহণ করতে থাকে।
যাহোক, এই ছিল পর্তুগীজ বনিকদের বণিজ্য উদ্দেশ্যে আগমন ও রাজনীতিতে পদার্পনের সংক্ষিপ্তসার। আরেকটু বলে রাখা ভালো পর্তুগীজদের এদেশে আসার মূল কারণ ছিলো খ্রিস্টান রাষ্ট্রগুলোর উপর তৎকাrashed khanলিন মুসলিম শাসকদের আধিপত্য ও ব্যবসায় বাণিজ্য সম্প্রসারণের ফলে পর্তুগীজরা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে ও নিজেদের দেশ ছেড়ে ভারতীয় উপমহাদেশে পাড়ি জমাতে থাকে। কিন্তু এখানেও তারা ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে আরব মুসলিদেরই মুখোমুখী হলো। তার মানে হলো, তৎকালিন বিশ্বে মুসলিম গণই ব্যবিসায়-বাণিজ্য, শিল্প-সাহিত্য ও রাজনীতি ও শাসন ব্যব¯’ায় অগ্রসরমান ছিলেন।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর নামে ইংরেজদের বাংলা-ভারতে আগমনঃ
র‌্যাফল ফীচ ১৫৯১ সালে ভারতবর্ষ সফর করেন। তাঁর উৎসাহ ও পর্তুগীজদের বাণিজ্যিক সাফল্য ইংরেজদেরকে ভারতবর্ষে বাণিজ্য করতে বিষেশভাবে আগ্রহী করে তুলেছিল। প্রাচ্যের সাথে বাণিজ্য করার উদ্দেশ্যে ইংরেজরা ১৫৯৯ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর টমাস ¯œাইডের সভাপতিত্বে একটি বাণিজ্যিক সংঘ গঠন করে। ঐ বছরই অর্থাৎ ১৫৯৯ সালে জন মিলল্ড্রেন হল ইংল্যা-ের রাণী এলিজাবেথের (শাসনকাল ১৫৫৮-১৬০৩ সাল) কাছ থেকে একটি অনুরোধ পত্র নিয়ে স¤্রাট আকবরের দরবারে হাজির হন। ঐ অনুরোধপত্রে ইংরেজ বণিকদেরকে পর্তুগীজ বণিকদের মতো বাণিজ্যিক সুবিধা প্রদানের অনুরোধ জানানো হয় রাণীর পক্ষ থেকে। রাণী এলিজাবেথের প্রভবের ফলে এই বাণিজ্যিক সংঘ পরবর্তী বছর প্রাচ্যের সকল দেশের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ¯’াপনে সমর্থ হয়। ১৬০০ সালে লন্ডনে প্রতিষ্ঠিত এ বাণিজ্যিক সংঘ একই সালের ৩১ শে ডিসেম্বর রাণী এলিজাবেথের একটি সনদ পেয়ে “ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী” নামে পরিচিতি পায়। এই কোম্পানীর শেয়ার হোল্ডার ছিল ২১৮ জন। একজন শাসন কর্তা ও ২৪ জন শেয়ার হোল্ডার দ্বারা এই কোম্পানীর কার্যনির্বাহী পরিষদ গঠিত হয়েছিল।
“ইস্ট ইন্ডিয়া কো¤পানী” প্রথম কয়েক বছর ভারতবর্ষের সাথে বাণিজ্য ¯’াপনের চেষ্টা না করে সুমাত্রা, জাভা, মালাক্কা প্রভৃতি ¯’ানে মশলার ব্যবসা আরম্ভ করে। “দি ক্যাম্ব্রীজ হিস্টোরী অব ইন্ডিয়া’ গ্রন্থের ভাষ্য মতে ক্যাপ্টেন উইলিয়াম হকিন্স ১৬০৮ সালে ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম জেমসের সুপারিশপত্র নিয়ে বাণিজ্যকুঠি সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে সম্রাট জাহাঙ্গীরের দরবারে আগমন করেন।ক্যাপ্টেন উইলিয়াম হকিন্সের আবেদনের  প্রেক্ষিতে সম্রাট জাহাঙ্গীর ১৬১৩ সালে ভারতের পশ্চিম উপকূলীয় বন্দর সুরাটে ইংরেজদের বাণিজ্য কুঠি নির্মাণের অনুমতি দেন।১৬২৩ সালে মুঘল সম্রাট জাম্হাঙ্গীরের সাথে চুক্তির শর্তানুসারে ইংরেজ কোম্পানী বাংলায় ও মুঘল সম্রাজ্যের সর্বোত্র বিনা শুল্কে বাণিজ্য করার অধিকার লাভ করে।ভূমিকা এখানেই শেষ করতে চাইে এই বলে যে, সরকারের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ কোনভাবেই সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ইতিহাস ঃ
খৃষ্টপূর্ব দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত বাংলাদেশের অর্থনীতির সুস্পষ্ট তথ্য ইতিহাসে পাওয়া যায় না। ২৪০০ বছর আগে বাংলাদেশে বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের আবির্ভাব ঘটে। এসময় বাংলায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র  স্বাধীন রাজ্য ছিল। ৩২০ সালে বাংলার প্রধান অংশ বৌদ্ধ স¤্রাজ্যের অধিনে চলে যায়। বৌদ্ধরা ১১৩০ সাল সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ শাসন করে। এরপর শুরু হয় হিন্দু সেন বংশের রাজত্বকাল। তারা প্রায় ১২০০ সাল পর্যন্ত বংলায় শাসন কার্য পরিচালনা করে। কোন পূর্ব ধারনা ছাড়াই ১১৯৯ সালে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মাদ বিন বখতিয়ার খিলজীর নদীয়া ও লক্ষণাবতী অভিযানের মধ্য দিয়ে শুরু হয়ে যায় বাংলায় মুসলমাদের শাসনের সোনালী যুগ। ১৭৫৭ সালের পলাশী ট্রাজেডি পর্যন্ত মুসলিম শাসন বহাল থাকে। এরপর শুরু হয় ইংরেজ বেনিয়াদের অবৈধ শাসন। হিন্দুদের সহায়তায় শুরু হয় মুসলিম নিধন। কৃষ্ণচন্দ্রের জীবন কাহিনী রচয়িতা রাজিব লোচন লেখেন, “হিন্দু জমিদার ও প্রধানগণ সিরাজউদ্দৌলাকে সিংহাসনচ্যুত করতে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিলেন। সিপাহী বিপ্লবের ব্যর্থতায় বাংলার হিন্দু বুদ্ধিজীবীরা উল্লাসে ফেটে পড়েন। মুসলমানদের প্রতি ধিক্কার জানিয়ে গদগদ ভাষায় তারা ইংরেজ শাসকদের প্রতি তাদের আনুগত্য নিবেদন করেন। সাহিত্য সম্রাট ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টপাধ্যায় সংবাদ প্রভাকর এ লেখেন,
“হে পাঠক, সকলে উদ্বাহু হইয়া ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিয়া জয়ধ্বনি করিতে করিতে নৃত্য কর। আমাদের প্রধান সেনাপতি মহাশয় মক্ষম হইয়া দিল্লি প্রবেশ করিয়াছেন।পাঠকগণ জয় জয় বলিয়া নৃত্য কর, হিন্দু প্রজা সকল, দেবালয়ে পূজা দেও, আমাদের রাজ্যেশ্বর শত্রুজয়ী হইলেন।”
আর কবি ঈশ্বরগুপ্ত মুসলমানদের প্রতি ধিক্কার জানিয়ে গদগদ চিত্তে ইংরেজদের প্রতি আনুগত্যের শীর নিবেদন করে লিখলেনঃ
“যবনের যত  বংশ এবাংশ এবারে হবে ধরে হবে ধ্বংস
সাজিয়াছে কোম্পানীর সেনা
গরু জরু লবে কেড়ে, চাপ দেড়ে যত নেড়ে
এই বেলা সামাল সামাল”
কবি ঈশ্বর গুপ্ত চিরকালের জন্য বৃটিশদের রাজত্ব কামনা করে আরও লিখলেনঃ
চিরকাল হয় যেন বৃটিশের জয়।
বৃটিশের রাজলক্ষ্মী স্থির যেন রয়।।
এমন সুখের রাজ্য আর নাহি হয়।
শাস্ত্রমতে এই রাজ্য রামরাজ্য কয়।।

মুসলিম বিদ্বেষ, বৃটিশের দালালি ও নিকৃষ্ট সাম্প্রদায়িকতা যেন  একসাথে গলাগলি করছে! ঈশ্বরগুপ্তের আরেকটি নিকৃষ্ট কবিতা…

একেবারে মারা যায় যত চাপ দেড়ে (চাপ দাড়িওয়ালা)।
ঘাঁসফাঁস করে যত প্যাঁজখোর নেড়ে ॥
বিশেষতঃ পাকা দাড়ি পেট মোটা ভুঁড়ে।
রৌদ্্র গিয়া পেটে ঢোকে নেড়া মাথা ফুঁড়ো ॥
কাজি কোল্লা মিয়া মোল্লা দাঁড়িপাল্লা ধরি।
কাছা খোল্লা তোবাতাল্লা বলে আল্লাহ মরি ॥

এই সাম্প্রদায়িকতার পরিনাম যে ভারতবর্ষের ইতিহাসে মোটেই প্রীতিকর হয়নি যা ইতিহাস অনুরাগী পাঠকবৃন্দের জানা আছে।

মুসলিদের সরিয়ে দেয়া হয় শুধু শাসন ব্যব¯’া থেকে নয়, তাদেরকে বঞ্চিত করা হয় সকল রাষ্ট্রিয় সুযোগ-সুবিধা থেকে, শিক্ষার অধিকার থেকে, চাকুরীর অধিকার থেকে, শিল্প-সাহিত্য থেকে, সর্বোপরি ব্যবসা-বাণিজ্য ওশিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ার অধিকার থেকে।

কলকাতায় গণহত্যা-মহাহত্যাযজ্ঞ

অনেকেই ৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহকে আমাদের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম মনে করেন। এ ধারণা সঠিক নয়।আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয়েছিল সেই ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন যেদিন পলাশীর আম্রকাননে বাংলার স্বাধীনতার সূয্য অস্তমিত হয়েছিল তার অব্যহতি পর থেকেই। আর সেই স্বাধীনাতা সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বিশ্বাসঘাতক মীর জাফর আলীর জামাতা মীর কাশিম।বহু যুদ্ধ বিগ্রহের পর তাঁর করুন মৃত্যু হলেও তিনি কখনও ইংরেজদের সাথে সন্ধির কথা কল্পনাও করেননি।

সিপাহী বিপ্লবঃ স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক মুক্তির টার্নিং পয়েন্টঃ
মীর কাশিমের পর মজনু শাহের নেতৃত্বে ফকির বিপ্লব, তিতুমিরের বাঁশের কেল্লার সংগ্রাম, হাজী শরীয়তুল্লাহ ও দুদু মিয়ার নেতৃত্বে ফরায়েজী আন্দোলন, দক্ষিণ ভারতের টিপু সুলতানের স্বাধীনতার সংগ্রাম, সৈয়দ আহমদ ব্রেলভীর নেতৃত্বাধীন জিহাদ আন্দোলন প্রভৃতির পাশাপাশি বাংলাদেশের নীল বিদ্রোহ ও বিভিন্ন কৃষক বিদ্রোহে নির্যাতিত মুসলমানদের ভূমিকা ছিল প্রধান।এসব বিদ্রোহ ও স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের সশস্ত্র সংগ্রামের পটভূমিতেই সংঘটিত হয় ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লব। যে বিপ্লবকে ঐতিহাসিকগণ মহাবিদ্রোহ বলে অভিহিত করেছেন।

১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের কারণঃ
ক) রাজনৈতিক কারণঃ
অযোধ্যা দখল, মুঘল সম্রাটের প্রতি দুর্ব্যবহার, ইংরেজ কমর্চারীদের জুলুম-শোষণ, আশ্রিত রাজ্যে কুশাসন, উপজাতিগুলোর বিক্ষোভ, মুসলমানদের দুদর্শা।
খ) অর্থনৈতিক করণঃ
অর্থনৈতিক শোষণ ও জমিদারদের বিতাড়ন, জমিদার শ্রেণীর বৃটিশ বিরোধী মনোভাব ও কৃষকদের আর্থিক দুরবস্থা, কুটির শিল্পের বিলুপ্তি, বহির্বাণিজ্যে ইংরেজদের একক কর্তৃত্ব, ধনসম্পদ ব্রিটেনে পাচার, দিশীয় শিল্পের বিলুপ্তি, জীবিকা নির্বাহে ব্যাঘাত, কোম্পানীর লোভ-লালসা।
গ) সামাজিক কারণঃ
ভারতবাসীর প্রতি ইংরেজদের ঘৃণা, চাকুরীর ক্ষেত্রে অবজ্ঞা, শাসিতের প্রতি অবজ্ঞা, ক্রমবর্ধমান পাশ্চাত্য প্রভাব, সামরিক কর্মকর্তাদের দূর্নীতি।
ঘ) ধর্মীয় কারণঃ
ভারতবাসীর ধর্মান্তরীত হওয়ার ভীতি, খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত করার চেস্টা, পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রবর্তন ও ধর্মীয় সংস্কার, মুজাহিদ আন্দোলনের প্রভাব, ধর্মীয় প্রথায় হস্তক্ষেপ, শাহ নিয়ামতউল্লাহর ভবিষ্যত বাণীর প্রভাব।
ঙ) সামরিক কারণঃ
দূরদেশে গমনে সিপাহীদের আপত্তি, বেতনের ব্যাপারে বৈষম্যমূলক নীতি, সিপাহীতের বেতনের স্বল্পতা, ইংরেজ সামরিক অফিসারদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ ব্যবহার, দেশীয় সৈন্যদের সমুদ্র পাড়ী দিতে বাধ্য করা, পদোন্নতির ব্যাপারে বৈষম্যমূলক নীতি, সিপাহীদের সংখ্যানুপাতে ইংরেজ সৈনিকের সল্পতা, ক্রিমিয়ার যুদ্ধের প্রতিক্রিয়া।
চ) প্রত্যক্ষ কারণঃ
চর্বিমিশ্রিত কার্তুজের ব্যবহারে প্রতিক্রিয়া, মঙ্গোল পাণ্ডের বিদ্রোহ ঘোষণা।
কার্ল মার্কসের মতে, ইংরেজ বেনিয়া কোম্পানী শাসনের বিরূদ্ধে শোষকদের অত্যাচার অতিমাত্রায় কর ও শুল্ক আরোপ দেশীয় শিল্পের বিনাশ সাধন প্রভৃতি। তিনি বলেন শোষনের ও নিপীড়নের ফলে এমন অবস্থার উদ্রেক হয় যে, বিদ্রোহ অনিবার্য হয়ে উঠেছিল।
মুসলিম-পূর্ব বাংলায় মানুষের প্রধান পেশা ছিল কৃষি ও পশুপালন এবং মৎস আহরণ। হিন্দু ও বৌদ্ধ শাসনামলে বংলাদেশের বিভিন্ন ¯’ানে শহর গড়ে ওঠে। সপ্তম শতাব্দী পর্যন্ত হিন্দুরা পারস্য, আরব, চীন ও আফ্রিকা পর্যন্ত বহির্বাণিজ্য বিস্তার করেছিল। সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত সময়কালে মুসলমান বণিকগণ নিকট প্রাচ্য বিশেষতঃ ভারতীয় হিন্দু ও বৌদ্ধ বণিকদের নকিট থেকে বাণিজ্য দখল করে নেয় এবং ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশসহ সমগ্র ভারতবর্ষে মুসলমান ব্যবসায়ীদের প্রধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়। ব্যবসা-বাণিজ্যের সূত্র ধরে এদেশে মুসলমানদের আগমন ঘটলেও তারা সাথে করে নিয়ে আসে ইসলা ধর্মের সুমহান আদর্শ। কুরআনের মাধ্যমে ইসলাম প্রচারের সুবাদে এখানে ক্রমান্বয়ে মুসলমানদের রাজনৈতিক প্রতিপত্ত্বি সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলায় মুসলমানগণ ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকে অষ্টাদশ শাতাব্দী পর্যন্ত শাসনকার্য চালায়।

মুসলিম শাসনামলে উৎপাদন ব্যব¯’া ছিল সামন্ততান্ত্রিক ও কৃষিপ্রধান। কুটির শিল্পও চালু ছিল। এ যুগে বাংলাদেশে কৃষি কাজের প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়। সেকালে জমির ঊর্বরতা ও কৃষিজাত ফসলের স্বল্প মূল্যের জন্য বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের খ্যাতি ছিল। ইবনে বতুতা ১৩৪৫ সালে বাংলাদেশ পরিভ্রমণকালে মেঘনার উভয় তীরে সমৃদ্ধ কৃষিক্ষেত ও ফল-ফলাদির বাগান দেখতে পান। চীনা পরিব্রাজক পঞ্চদশ শতাব্দীতে বাংলাদেশের কৃষিতে পরিপূর্ণ মাঠ দেখে বলেছিলেন, “স্বর্গ এদেশে স্বর্ণ ঢেলে দিয়েছে”। বাদশা আকবরের মন্ত্রী আবুল ফজল বাংলাদেশে দ্রুত বর্ধনশীল ধানগাছ দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন। সেকালে বাংলাদেশের উৎপাদিত চাল দেশের চাহিদা মিটিয়ে প্রতিবশী দক্ষিণ ভারত, সিংহল ও মালদ্বীপে রপ্তানী করা হত। চাল ছাড়াও সেসময় নারিকেল, মরিচ,আদা, হলুদ,পিঁয়াজ ও অন্যান্য কৃষিজাত পণ্যও উৎপাদিত হত এবং পারস্য উপসাগরীয় দেশসমূহে, আফ্রিকা, চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কোন কোন দেশে রপ্তানী করা হত। ইক্ষুজাত চিনিও রপ্তানী হত। এ সময় পাটের উৎপাদনও হত, তবে তা বাণিজ্যিকভাবে শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হত না।

শেরশাহ ভূমি ব্যব¯’াপনায় ব্যপক ও যুগান্তকারী পরিবর্তন আনেন। স¤্রাট আকবরের আমলে বাংলাদেশের অধিকাংশ এলাকা ছিল বার ভূঁইয়াদের দখলে। আকবরের অর্থমন্ত্রী টোডরমল অখন্ড বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার অংশ বিশেষে ১ কোটি ৬ লক্ষ ৯৩ হাজার টাকা রাজস্ব নির্ধারণ করেছিলেন। মোঘল যুগে প্রাদেশিক দেওয়ান মুর্শিদকুলি খানের আমলে বাংলাদেশের অর্থনীতি সর্বাপেক্ষা অগ্রগতি লাভ করে। তিনি ভূমি রাজস্ব আদায় পদ্ধতিতে যুগপযোগি ও যুগান্তকারী পরিবর্তন আনেন। তাঁর আমলে রাজস্বের পরিমাণ এতটাই বৃদ্ধি পায় যে, মুঘল স¤্রাজ্যে বাংলার রাজস্ব সর্বাপেক্ষা লাভজনক সম্পদে পরিণত হয়। মুর্শিদকুলি খানের আমলে বাংলায় কৃষি উৎপাদনের পাশাপাশি শিল্পোৎপাদনও বৃদ্ধি পায়। এর ফলে অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম দিকে বাংলায় চাউলের দাম ছিল মণ প্রতি মাত্র ২৫ পয়সা। যা ইতিহাস হয়ে রয়েছে। সরকারী নীতি ও সরকারের সদি”ছা যে কৃষি ও শিল্পে কত গুরুত্বপূর্ণ তা এখানে অনুমান করা যায়। মুর্শিদকুলি খান অর্থনীতিতে সরকারের ভূমিকাকে পৃষ্ঠপোষক হিসেবে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তিনি দূর্ভিক্ষ প্রতিরোধের জন্য চাউলের এক চেটিয়া ব্যবসা এবং রপ্তানী নিষিদ্ধ করেন। “রিয়াজ-উস-সালাতিন”এর লেখক বলেছেন যে, মুর্শিদকুলি খান খাদ্য শস্যের দাম সস্তা রাখতে খুবই সচেষ্ট ছিলেন। তিনি ধনীদের খাদ্য শস্য মওজুদ করতে দিতেন না। প্রতি সপ্তাহেই খাদ্য শস্যের বাজার দরের বিবরণী তৈরী হত এবং গরীব লোকেরা সত্যিই কি দাম দিয়ে এসব জিনিস পত্র কিনছে তা তুলনা করে দেখা হত। যদি দেখা যেত যে, এসব গরীব লোকের কাছ থেকে চলতি বাজার দরের চাইতে এক পয়সাও বেশী নেয়া হয়েছে তাহলে তিনি সেই ব্যবসায়ী, মহলদার ও ওজনদারকে নানা ভাবে শাস্তি দিতেন। তাদেরকে গাধার পিটে চাপিয়ে সারা শহর ঘোরানো হত, তিনি সরকারী কর্মচারীদের ব্যবসা-বাণিজ্যে এক চেটিয়া অধিকার বন্ধ করে প্রকৃত ব্যবসায়ীদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করেন। তিনি প্রকৃত ব্যবসায়ীদের যথাযথ মর্যাদা দেন।

মুসলিম শাসনামলে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় নানান ধরনের শিল্প কারখানা গড়ে উঠেছিল। বাংলাদেশের মসলিন প্রাচীন কাল থেকেই বিশ্ববিখ্যাত। খৃষ্টীয় প্রথম শতকে রচিত “পেরিপ্লাস অব দি এরিত্রিয়ান সী” গ্রšে’ রপ্তানী পণ্যের তালিকায় বাংলাদেশের মসলিন বস্ত্রেরও উল্লেখ আছে। নবম শতাব্দীতে আরব বণিক সুলায়মান লিখেছেন যে, বাংলাদেশ এমন সূক্ষ্ম বস্ত্র তৈরী করে যা অন্য দেশ তৈরী করতে পারে না। ঐ বস্ত্র এতই সূক্ষ্ম ছিল যে একটি পোশাক একটি অঙ্গুরীর মধ্যে সম্পূর্ণভাবে প্রবেশ করানো যায়। মুঘল শাসকগণ বাংলায় কাপড় প্র¯‘তের জন্য তাঁতীদের রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় কারখানায় কাজ করার সুবিধা দিতেন। মসলিন ছাড়াও সে সময় রেশমী ও কার্পাস বস্ত্র তৈরী হত। এছাড়া পুরুষদের জন্য তৈরী সোনার কাজ করা টুপি আরব ও পারস্যে রপ্তানী হত। মুঘল বাদশাহরা প্রতিটি মসলিন শাড়ীর জন্য তৎকালে ২০০ টাকা দিতেন। ১৭৯৩ সালে বৃটিশ বেনিয়াদের আমলে সেই মসলিনের দাম নেমে আসে মাত্র ২০ টাকায়। সরকারের সহায়তা ছাড়া কোন শিল্পই টিকিয়ে রাখা যায় না, মসলিন শিল্পও বৃটিশ সরকারের মুসলমান বিদ্বেষী মনোভাবের কারণে ধ্বংস হয়ে যায়। সে আমলে সরকারী সহায়তায় জাহাজ বা নৌ শিল্পের ব্যাপক উন্নতি ঘটেছিল। সিজার ফেডারিকের মতে, আলেকজান্দ্রিয়ায় নির্মিত জাহাজের তুলনায় চট্রগ্রামে তৈরী জাহাজের অধিক কদর ছিল। তুরস্কের সুলতান গুনগত মানে উন্নত বলে চট্রগ্রাম থেকে জাহাজ তৈরী করাতেন। ভেনিশীয় পর্যটক মিশিরা বলেছেন যে, চট্রগ্রাম ও সন্দীপে জাহাজ নির্মাণের জন্য উপযোগী উৎকৃষ্ট কাঠ প্রচুর পাওয়া যেত। নবাব শায়েস্তা খান (১৬৬৪-১৬৮৯ সাল)ও নবাব মীরজুমলা ঢাকায় রণতরী নির্মাণ করিয়ে তা যুদ্ধে ব্যবহার করতেন। নবাব মীরজুমলা পর্তুগীজ ও মগ জলদস্যুদের বিরূদ্ধে ঢাকায় নির্মিত রণতরীতে নৌযুদ্ধ পরিচালনা করতেন। শায়েস্তা খান জলদস্যুদের কঠোর হস্তে দমন করার ফলে ইংরেজ বণিকেরা ব্যাপক ভাবে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করে। সুলতান গিয়াসউদ্দীন আজমশাহের আমলে (১৩৮৯-১৪০৯ সাল) বাংলাদেশে বৈদেশিক বাণিজ্যের ব্যাপক প্রসার ঘটে। চীনা পর্যটক মাহুয়েন তাঁর বর্ণনায় এ সমুদ্রপথে বাংলায় বিপুল বহির্বাণিজ্যের কথা উল্লেখ করেন। স¤্রাজ্ঞী নূরজাহানের ভ্রাতা ইব্রাহীম খান বাংলার শাসক হিসেবে ঢাকায় অব¯’ানকালে (১৬১৭-১৬২৩ সাল) দেশের কৃষি, শিল্প, ও বাণিজ্যে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় যথেষ্ঠ অগ্রগতি লাভ করে। সে সময় দেশে যুদ্ধবিগ্রহ না থাকায় অর্থনৈতিক কার্যকলাপ বৃদ্ধি পায়। ঢাকার মসলিন ও সিল্ক মুঘল রাজপরিবারের রাজকীয় পোষাকের প্রধান উপাদানরূপে ব্যবহৃত হতে শুরু করে।
ইংরেজ আমলে সকরার কর্তৃক ভারতীয় কংগ্রেস দল গঠনঃ
হিন্দু জমিদারদের জুলুম-নির্যাতনের বিরূদ্ধে ১৮৭৩ সালে পাবনা জেলার সিরাজগঞ্জ মহকুমায় ইউসুফশাহী পরগণায় বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। পরবর্তীতে তা বগুড়া জেলায়ও ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনায় বৃটিশ রাজের টনক নড়ে এবং তারা প্রজাস্বত্ব আইন সংশোধনে সক্রিয় হয়। ১৮৮৫ সালে ‘বেঙ্গল প্রজাস্বত্ব আইন’ জারী করা হয়। এ আইন যদিও পূর্ববর্তী আইনগুলোর তুলনায় উন্নততর, কিন্তু জমিদার ও প্রজার মধ্যে বিরাজিত সমস্যার কোন চূড়ান্ত সমাধান দিতে পারেনি। হিন্দু জমিদারগণ ১৮৮৫ সালের প্রজাস্বত্ব আইনের বিরূধ্যে সমবেত হয় এবং তীব্র সমালোচনা করে।তারা ‘দি বৃটিশ ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশন’ নামে একটি সংগঠন গঠন করে।এ সময় বাংলায় গভর্ণর জেনারেলের পরিষদে একমাত্র মুসলিম সদস্য স্যার সৈয়দ আমীর আলী ছাড়া আর কেউ ছিলেন না।
ঠিক এই সময় বৃটিশ ভারতের রাজনৈতিক পরিমন্ডলে যে উত্তেজনা পুঞ্জিভূত হচ্ছিল তাকে প্রশমিত বা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার উদ্দেশ্যে ইংরেজরা ভারতীয়দের নিয়ে একটি সংগঠন গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করে। এ. ও. হিউম নামক এক ইংরেজ আমলাকে দল গঠনের দায়িত্ব দেয়া হয়। তদানিন্তন বৃটিশ ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জের সঙ্গে মিস্টার হিউম পরামর্শ করে “ভারতীয় কংগ্রেস” নামে একটি দল গঠনের ব্যবস্থা করেন। এর ফলশ্রুতিতে ১৮৮৫ সালে এ দল প্রতিষ্ঠিত হয়। ভারতের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী অর্থাৎ প্রধানত হিন্দুরাই কংগ্রেসের পতাকাতলে সমবেত হয়।উল্লেখ্য, তখন ভারতে বিশেষত বাংলার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বলতে মূলত হিন্দু সম্প্রদায় থেকে আগত লোকদেরকেই বোঝাত।তবে এ সময় কিছু মুসলমানও এ দলে যোগ দেন। কিন্তু অচিরেই বালগঙ্গাধর তিলকের ন্যায় কতিপয় কংগ্রেস নেতার উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদী কর্মকান্ড মুসলমানদেরকে কংগ্রেস থেকে দূরে ঠেলে দেয়। মুসলমানরা উপলব্ধি করতে থাকেন যে, কংগ্রেসে যোগ দিয়ে মুসলমানরা তাদের পশ্চাৎপদ অবস্থা থেকে উঠে আসতে সক্ষম হবে না। কারণ কংগ্রেস নেতৃত্ব আসলে হিন্দুদের স্বাথর্কেই ভারতীয় স্বার্থ বলে চালিয়ে দিতে তৎপর ছিল। মুসলমানরা নিজেদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কল্যাণের লক্ষ্যে ইংরেজদের সাথে দর কষাকষির জন্য ১৯০৬ সালে “মুসলিম লীগ” নামে পৃথক দল গঠন করে।

 
নওয়াব আব্দুল লতিফ ও স্যার সৈয়দ আমীর আলীঃ
উপমহাদেশে অবৈধ বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বৈষম্যমূলক নীতি ও শোষক গোষ্ঠীর নির্মম অত্যাচার ও শোষনে অতিষ্ট হয়ে মুসলমানরা বিচ্ছিন্নভাবে রুখে দাঁড়াতে শুরু করে।মুসলমানদের প্রতি ইংরেজদের বিরূপ মনোভাব আরো প্রবলতর হয়। ঔপনিবেশিক সরকারের দীঘর্কালীন বৈষম্যেমূলক নীতির ফলশ্রুতিতে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের মত বাংল্রা মুসলমানরা প্রায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় ঊনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বাংলার মুসলিম সমাজে নতুন নেতৃত্বের আবির্ভাব ঘটে। নওয়াব আব্দুল লতিফ এ সময় মুসলমানদের নেতৃত্ব দানে এগিয়ে আসেন।তিনি স্যার সৈয়দ আহমেদের মত বৃটিশ সরকারের সাথে বৈরিতার পরিবর্তে সহযোগিতার নীতি গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে স্যার সৈয়দ আমীর আলী তাঁর সাথে যুক্ত হন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল নতুন প্রেক্ষাপটে শিক্ষা-দীক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকুরী ও জীবিকার উপায় ইত্যাদির ক্ষেত্রে মুসলমানদের অনগ্রসরতা ও প্রতিবন্ধকতা দূরিভূত করা। তাঁরা উভয়েই কৌশল হিসেবে সরকারের সাথে সহযোগিতা করে সরকারের প্রতি আবেদন-নিবেদন করে এবং ক্ষেত্র বিশেষে প্রয়োজন মত সরকারের উপর চাপ সৃষ্টির প্রতি গুরুত্বারোপ করেন।তাঁদের এই কৌশল পরবর্তীকালে খুব্ই ফলপ্রসু বলে প্রমাণিত হয়েছিল।১৮৭৭ সালে স্যার সৈয়দ আমীর আলী ‘ন্যাশনাল মহামেডান এসোসিয়েশন’ গঠন করেন।এ সংগঠনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ন্যায় সংগত শাসনতান্ত্রিক পদ্ধতিতে মুসলমানদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।এ সংগঠনটি প্রতিষ্ঠিত হবার পর তিনি মুসলমানদের অধিকার আদায়ের জন্য বিভিন্ন দাবি-দাওয়া বটিশ রাজের নিকট উত্থাপন করেন।স্যার সৈয়দ আমীর আলী লিখিত ‘দি স্প্রিট অব ইসলাম’ এবং ‘এ হিস্টোরী অব ইসলাম তৎকালের শিক্ষিত মহলে খুবই জনপ্রিয়তা লাভ করে ও বিধর্মীদের নিকট ইসলাম একটি যুক্তিপূর্ণ ও উদারনৈতিক ধর্ম হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

বাংলাদেশে শিল্পায়নঃ
শিল্পায়ন বলতে সাধারণতঃ উৎপাদনকে বুঝান হয়।এ খাত কাঁচামালের রূপ পরিবর্তন করে।এটার নাম ফরম ইউটিলিটিস, উদাহরণ স্বরূপ তুলা হতে বস্ত্র উৎপাদন, পাট হতে বস্তা বা কার্পেট বানান, ধান হতে চাউল, চাউল হতে ভাত, গম হতে আট তৈরী করা। সুতরাং উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন হয় কাঁচামাল ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি। ইমপুট হলেই কেবল আউটপুট পাওয়া যাবে। কারখানার উৎপাদিত পণ্য বিক্রয়ের জন্য উপযুক্ত বাজার চাই। ক্রেতার নিকট পৌঁছে দিতে চাই পরিবহণ ব্যবস্থা। পরিবহণ ব্যবস্থার উন্নতির সাথে সাথে বাজার বৃদ্ধি পাবে তাল মিলিয়ে। পরিবহণ ব্যবস্থার আওতায় এক স্থানের মানুষ বা এক দেশের মানুষ অন্য দেশের পণ্য সামগ্রী ভোগ বা ব্যবহার করতে পারে। সব পণ্যের জন্যেই চাই আধুনিক গুদাম ব্যবস্থা বা খাদ্য পণ্যের জন্য চাই হিমঘর বা হিমাগার ।  এ সমস্ত ভৌত অবকাঠামো তৈরীতে সরকারের সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অন্যথায় শিল্প-বাণিজ্য প্রসার লাভ করতে পারবে না।

 রপ্তানী বাণিজ্যে আমাদের ঐতিহ্যঃ
বাংলাদেশের অর্থনীতি চিরকালই আমদানী নির্ভর ছিলনা। এক সময় রপ্তানী বাণিজ্যে আমাদের সুনাম ছিল।আমাদের মসলিন কাপড় বিশ্ব বাজারে সর্বোৎকৃষ্ট সৌখিন বস্ত্র হিসেবে মর্যাদার আসন লাভ করেছিল।আমাদের পণ্য সম্ভার নিয়ে বাংলার দুঃসাহসী নাবিকেরা তরঙ্গ বিক্ষুব্ধ দরিয়া পাড়ি দিয়ে পৌঁছে যেত বহির্বিশ্বের বন্দরে বন্দর্। কিন্তু, দীর্ঘদিনের বৃটিশ-বেনিয়াদের অবৈধ শাসন-শোসনের ফলে আমাদের সেই সোনালী অতীত হারিয়ে গেছে মহাকালের নিকষ কালো অন্ধকারে। আর তাই অন্যের সাহায্যের উপর নির্ভর করেই প্রণয়ন করতে হয় আমাদের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জন্য বাৎসরিক বাজেট।এই গ্লানিকর অবস্থা থেকে মুক্তি লাভ করে আত্মনির্ভরশীল ও একটি মর্যাদা সম্পন্ন জাতি হিসেবে বিশ্ব সভায় মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে ব্যাপক শিল্পায়ন ও রপ্ততানীমূখী অর্থণনীতি গড়ে তোলা ব্যাতিরিকে দ্বিতীয় কোন পথ খোলা  নেই। তাই আমাদেরকে উৎপাদনই সমৃদ্ধি” এই শ্লোগান তুলে “সাহায্য নয় বাণিজ্য” এই উচ্চারণ নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার ব্রত নিতে হবে।

 শিল্পায়নের গুরুত্ব ও বাণিজ্যের বিকাশঃ
আর এতে কোন সন্দেহ নেই যে, স্বনির্ভরতা অর্জন, বেকার সমস্যার সমাধান, ব্যাপক কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে অতি অবশ্যেই আমাদেরকে শিল্পায়নের দিকে সবার্ত্মক গুরুত্বারোপ করা অতি জরুরী হিসেবে পরিগণিত। সরকারকে বিনিয়োগের উৎসাগ জাগিয়ে তোলার জন্য শিল্পাঞ্চলে শান্তি-শৃঙ্খলার নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে। আকর্ষণ করতে হবে বিদেশী পূজিঁ বিনিয়োগকে আর বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশীদেরকেও সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে দিতে হবে।শিল্পায়নে স্থানীয় উদ্যোক্তাদেরকে পরবর্তী ১০ বছরের জন্য ট্যাক্স হলিডে সুবিধা দিয়ে স্থানীয় বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে হবে।অভ্যন্তরীন ও বৈদেশিক বাণিজ্য বিকাশ ত্বরান্বিত করার জন্য বাণিজ্যিক লেন-দেন ও বিধি ব্যবস্থা ত্বরান্বিত করার কোন বিকল্প নেই। এই মুহুর্তে আ্মাদের বাণিজ্য সম্প্রসারণের জন্য সবচেয়ে জরুরী হয়ে পড়েছ্ েএকটি স্থায়ী বাণিজ্য ও শিল্প সামগ্রী প্রশর্নীর জন্য মেলার কেন্দ্র যেখানে দেশী-বিদেশী ক্রেতাগণ আমাদের উৎপাদিত পণ্য সামগ্রীর গুনাগুন যাচাই করে ক্রয় করার জন্য সিদ্ধান্ত নিতে পারে একটি ছাদের নীচে থেকেই। এক্ষেত্রে সরকার একটি বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্র গড়ে তুলতে পারে।সরকারের সাথে স্থানীয় এবং বৈদেশিক বাণিজ্য সংস্থাগুলোর বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি ও সহজতর করা জরুরী। সরকারী মিশন ও বাণিজ্য মিশন গুলোর মধ্যেও সম্পর্ক ও যোগাযোগ বৃদ্ধি করার জন্য প্রয়োজীয় পদক্ষেপ নেয়া আবশ্যক। ঢাকা আন্তার্জাতিক বাণিজ্য মেলাকে গণচীনের ক্যান্টন মেলার আদলে ঢেলে সাজানো সময়ের দাবী হয়ে উঠেছে।

লেখক
মোঃ রাশেদ খান
চেয়ারম্যান-মডার্ণ স্ট্রাকাচারস লিমিটেড, ঢাকা।

Kushtiar Diganta
By Kushtiar Diganta February 12, 2017 13:20