মরহুম দেলাওয়ার হুসাইন-আল্লাহর দ্বীনের অগ্রপথিক

Kushtiar Diganta
By Kushtiar Diganta February 28, 2017 15:44

মরহুম দেলাওয়ার হুসাইন-আল্লাহর দ্বীনের অগ্রপথিক

অধ্যাপক  ফরহাদ হুসাইন
হটাৎ করেই একটি ছন্দের পতন হলো। নির্জীব নিরবতায় তিনি এখন নিশ্চুপ। ইসলামী আন্দোলনের এক অকুতোভয় সৈনিক সবার প্রিয় দেলাওয়ার ভাই  চলে গেলেন না ফেরার দেশে। সোন্দাহ নন্দলালপুর হাই স্কুলের সাবেক সহকারী প্রধান শিক্ষক মোঃ দেলাওয়ার হুসাইন। তিনি ছিলেন কুষ্টিয়া জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারী, কুমারখালী উপজেলা জামায়াতের সাবেক আমীর এবং তাঁর নিজ জন্মভূমির সুপ্রিয় এক নান্দনিক সন্তান, সর্বজন শ্রদ্ধেয় দেলওয়ার ভাই ছিলেন নিজ এলাকার একজন জন প্রিয় ব্যক্তিত্ব।

জন্ম ও শিক্ষা ঃ তিনি ১৯৫৪ সালে কুষ্টিয়া জেলার  কুমারখালী থানার নন্দলালপুর ইউনিয়নের সোন্দাহ নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মোন্তাজ আলী শেখ, মাতার নাম তেলেজান খাতুন। গ্রামের প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষা শেষ করে তিনি কুমারখালী এম এন হাই স্কুলে ভর্তি হন। পরে কুষ্টিয়া সিরাজুল হক মুসলিম হাইস্কুল থেকে এস এস সি পাশ করেন। তিনি বি কম ও বি এড পাশ একজন অভিজ্ঞ  শিক্ষক ছিলেন।

কর্মজীবন ঃ ১৯৮১ সালের ১ জুন তিনি সোন্দাহ  নন্দলালপুর হাইস্কুলে শিক্ষকতার মহান পেশায় যোগদান করেন। এই স্কুলেই তিনি তাঁর কর্মজীবন শেষ করেন। সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন ২০১৪ সালে।

ইসলামী আন্দোলনে যোগদান ঃ ছাত্র জীবন থেকেই ইসলামী আন্দোলনে যোগদান করেন। বৃহত্তর কুষ্টিয়া জেলার ইসলামী ছাত্র শিবিরের তিনি সভাপতি ছিলেন। কর্মজীবনে এসে দ্বীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে 16113102_1827973577462779_2885022588927735157_oনিবিষ্ট  মনে আত্মনিয়োগ করেন। ইসলামের কাজকে তিনি জীবন উদ্দেশ্য হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। সারা জীবন এ মহৎ কাজের মধ্যেই নিবিষ্ট মনে থেকেছেন এবং এই মহৎ কাজের ভেতর দিয়েই তিনি তার জীবন কর্মের মহাব্রত পালন করে আল্লাহ তায়ালার প্রিয় সান্নিধ্যে চলে গেছেন।

নিরলস ও নির্মোহঃ  প্রিয় ভাই দেলাওয়ার  ছিলেন একজন দক্ষ সাংগঠক,যোগ্যনেতা, বলিষ্ঠ ও নিরলস সমাজকর্মী , সাবালিল ও সুস্পষ্ট বক্তা, সাহসী ব্যক্তিত্ব, সৎ নিষ্ঠাবান। কর্তব্যপরায়তা ছিল তার চরিত্রের ভূষন। রাজনীতি  ও আšেদালনে তিনি ছিলেন নিখুঁত নীতি নির্ধারক এবং দ্বীনের পথে একজন ধৈর্যশীল  ও ত্যাগি মানুষ।

ছাত্রশিবিরের জেলা সভাপতি হিসাবে তিনি  অত্যন্ত যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখেছেন। তার হাতে গড়া নেতাকর্মীরা তাঁকে ওস্তাদ হিসেবেই মান্য করে। তাঁরা তাঁর কুশলী নেতৃত্বে সবাই ছিল অতিশ্বয় মুগ্ধ।  কথা নয় আচরনেই বড় শিক্ষা দেওয়া যায় তার  বড় উদাহরণ দেলাওয়ার ভাই। কখনও কারোর ওপর তাকে রাগ করতে দেখা যায়নি। মিষ্টি ব্যবহার দিয়েই দ্বীনের দাওয়াত মানুষের হৃদয়-মনে পৌঁছে দিতে পারতেন।  এ দাওয়াত দানে তাঁর মধ্যে ছিলনা কোন হতাশা-নিরাশা। নেতৃ আদেশ পালনে তিনি ছিলেন দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ। এইতো, গেল শীত সমস্ত প্রকৃতি যখন কুয়াশা ঢাকা তখনও তিনি হাড় কাঁপানো শীতকে উপেক্ষা করে দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছে দিতে গেছেন মানুষের দ্বারে দ্বারে। পৌঁছেছেন দীন হীন গরীবের পর্নকুটিরে। সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন সাধ্যানুসারে। তুলে ধরেছেন মৃত্যু যবনিকার অপর পারের চিরস্থায়ী জীবনের বার্তা। তুলে ধরেছেন ঈমান একিনের নিগুঢ় তত্ত্বকথা। মানবতার কাজে সমাজে ছিল তাঁর অবিরাম পদচারণা। জন্ম-মৃত্যু,রোগ-শোক তাপে তাঁকে দেখা গেছে মানুষের পাশে সমব্যাথী হয়ে দাঁড়াতে।

ছাত্রজীবনে তিনি ছিলেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির কুষ্টিয়া জেলা শাখার সভাপতি। কর্মজীবনে প্রবেশ করার পরপরই যোগদান করেন বৃহত্তর ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে। ১৯৮৬ সালের ৩০ নভেম্বর তিনি জামায়াতের রুকন হন। ঐ বছরই তিনি কুমারখালী উপজেলার আমীর নির্বাচিত হন। অত্যন্ত যোগ্যতা ও দক্ষতার সাথেই তিনি উপজেলা সংগঠনকে সাজিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন নেতাদের নেতা অর্থাৎ নেতা প্রস্তুতকারী একজন নিপুন কারিগর। তারই হাত ধরে যাঁরা সংগঠনে যোগদান করেছিলেন তাদের অনেকেই সুপ্রতিষ্ঠিত জননেতা।

রাজনৈতিক জীবনে সকল দলের নেতৃবৃন্দের কাছেই ছিল তাঁর গ্রহণযোগ্যতা। যে কোন জাতীয় ইস্যুতে এবং দেশের কল্যাণে ছিলেন সবার সাথেই একাত্ম। অথচ তাঁর ম ধ্যে কখনও নেতৃত্বের লোভ দেখা যায়নি। তিনি ছিলেন নিরীহ প্রকৃতির সাদাসিদে প্রকৃতির মানুষ। কোন জাক-জমক, বিলাস-ব্যাসন ও কোন অর্থ-বিত্ত-সম্পদ তাঁকে আকৃষ্ট করতে পারেনি। সমাজ গঠনে,শিক্ষা বিস্তারে,এতিম লালনে, গরীবের সহায়তায় তিনি অগ্রনী ভূমিকা  রাখতেন। কুমারখালী আল ফালাহ এতিমখানা, সোন্দাহ-নন্দলালপুর মাদ্রাসা, মসজিদ নির্মাণ,দাতব্য চিকিৎসালয় পরিচালনাসহ বহু জনহিতকর কাজে এবং বিশেষ করে ছাত্রদের সহযোগিতা দানে তিনি অগ্রনী ভূমিকা পালন করেছেন। হক কথা ঝক করে বলার কারণে তিনি সামরিক সরকারের রোষুানলে পড়ে লে.জে. এরশাদের আমলে গ্রে ফতার হয়ে বিনা দোষে কারাবাসে দীর্ঘ সাত মাস কাটান। পরে ২০১৬ সালেও অনির্বাচিত আওয়ামী সরকারের রোষের শিকার হয়ে  গ্রেফতার হন।

দেলাওয়ার ভাই আকস্মিক ভাবেই  আমাদের  ছেড়ে চলে গেলেন এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটার শিকার হয়ে। তিনি সব সময়ই শাহাদাতের মৃত্যু কামনা করতেন- যা মুমিনের একান্ত কাম্য। তিনি প্রায়ই নফল রোযা রাখতেন। সেদিনও তিনি রোযা ছিলেন। ১৩ জানুয়ারী শুক্রবার। দাওয়াতী কাজে তিনি  ছিলেন সফররত মুছাফির। মটর সাইকেল চালিয়ে ঐদিন তিনি পোড়াদহ অভিমুখে যাচ্ছিলেন। বটতৈল-কবুর হাটের এক মোড় ঘুরতেই চলন্ত বাসের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষে আহত হলে কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় তাঁকে ভর্তি করা হয়। রো গীর অবস্থা ভা ল নয় বলে উন্নত চিকিৎ সা র জন্য তাঁকে 15977936_1827973524129451_8846927588465963170_nঢাকায় পাঠানো হয়। ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসারত অবস্থায় আল্লাহর পথের এই এর পথিক মহান প্রভূর সান্নিধ্যে চলে যান ১৭ জানুয়ারী ভোরে। ইন্নালিল্লাহি……………………। মৃত্যুকালে তিনি বৃদ্ধা মা, স্ত্রী, ৪ পুত্র ও ১ কন্যা এবং বহু গুনগ্রাহী রেখে গেছেন। প্রভূর দরবারে তাঁর সাথীদের আকুতি: তিনি যেন তাঁর মৃত্যুকে শাহাদাতের মৃত্যু হিসেবে কবুল করেন। আমীন।

Kushtiar Diganta
By Kushtiar Diganta February 28, 2017 15:44