ফারাজি মুন্সির দরবার অধিবেশন-২০১৭ (৪)

shohag
By shohag February 28, 2017 15:53 Updated

ফারাজি মুন্সির দরবার অধিবেশন-২০১৭ (৪)

বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিমঘোষক ঃ বন্ধুগন। ফারাজি মুন্সি গুলেবাতী এক্ষুনি এসে পৌঁছাবেন। আপনারা পাথরের মত নিশ্চুপ হইয়া যান। আজকের দরবার বসতে একটু লেট হইবে ( কেন লেট হবে একজনের প্রশ্নের জবাবে ) “বন্ধুগন, মুন্সির শরীর অনেকদিনের পুরনো। তাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন “ পুরাতন মনটাতে আর সয়না কোন নতুন জ্বালাতোন, আমায় হারিয়ে যেতে দে, আমায় পালিয়ে যেতে দে”। এই তো মুন্সি এসে পড়েছেন। ফারাজি মুন্সি গুলেবাতী হাজি…………………র।

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ।
প্রিয় দরবারী সাথীরা। দরবার শুরু করছি প্রশ্ন দিয়ে,

প্রশ্ন ঃ আচ্ছালামু আলাইকুম। মুন্সী সাহেব আমাদের এক আত্মীয় কথায় কথায় আমাদেরকে ওহাবী বলে গালি দেয়। ওহাবী কারা? এ গালিই বা দেয়া হয় কেন? জাফর সাদিক, জয়নগর, কিশোরগঞ্জ।
উত্তর ঃ কেন ওহাবী বলে এবং কেন গালি দেয় তা তাকেই জিজ্ঞেস কর। তাকে আরও বলো কোরআন হাদিস মোতাবেক আমি যদি ঠিকমত চলি তাহলে আমাকে গালি দিলে তা কোরআন হাদিসকেই গালি দেয়া হবে। তার উচিৎ হবে কোন কাজ যদি শরীয়ত সম্মত না হয় তাহলে সংশোধন করে দেয়া। গালি দেয়া ঠিক নয়।

প্রশ্ন ঃ মুন্সী সাহেব আচ্ছালামু আলাইকুম। মুন্সী সাহেব আমাদের এলাকায় এক ওয়াজ মাহফীলে এক বক্তার বক্তব্য শুনে জানতে পারলাম চন্দ্র সূর্যের আলোতে নবী করিম (সাঃ) এর দেহের ছায়া মাটিতে পড়তো না। তিনি নূরের নবী বলেই তার ছায়া মাটিতে পড়তো না। আসলেই কি রাসুল (সাঃ) এর ছায়া মাটিতে পড়তো না? ইকরামুল হক সায়েম, চাঁদপুর।
উত্তর ঃ আল্লাহর রসুল (সাঃ) নূরের তৈরী এ ব্যাপারে কুরআন হাদিসের কোন দলিল নেই। তিনি খেয়েছেন, হাটে বাজারে গিয়েছেন, বিয়ে করেছেন, তার সন্তান ছিল, তায়েফ বাসীরা তাকে মেরে রক্তার্থ করে দিয়েছে, তিনি ঘুমিয়েছেন, পায়খানা-প্রশাব করেছেন, তাঁর সুখ-দু:খ ছিল। তাঁর জন্ম হয়েছে তাঁর মৃতু হয়েছে। অর্থাৎ একজন মানুষের যা থাকার দরকার তাঁরও তাই ছিল। তাঁর ছায়া মাটিতে পড়তো কি পড়তো না এ ব্যাপারেও কোন হাদিস নেই। কোরআনও নাই, তিনিও বলে যান নাই আমি নূরের তৈরী, বরং বলেছেন, “ আমি তোমাদের মতই একজন মানুষ(আল কোরআন)। তোমার ঐ বক্তার কাছে জিজ্ঞেস করো, নবী নূরের তৈরী তা তিনি কোথায় পেয়েছে তার দলিল কি ?

প্রশ্ন ঃ আচ্ছালামু আলাইকুম। মুন্সী সাহেব কেউ যদি জিহাদ না করে তাহলে মুক্তি পাবে কিনা? হাফেজ আসাদুজ্জামান, দড়াটানা, যশোর।
উত্তর ঃ জিহাদ কথাটির প্রকৃত অর্থ হলো, ইসলাম প্রতিষ্ঠা করার জন্যে প্রানান্তকর প্রচেষ্টা চালানো। মারামারি গোন্ডগোল ফেসাদ বাধানো নয়। দ্বীন প্রতিষ্ঠার জিহাদ করা প্রত্যেক ঈমানদার মুসলমানদের জন্যে ফরজ। তবে প্রতিষ্ঠা করতে গেলে, ইসলাম সকল স্তরে প্রতিষ্ঠিত হোক এটা যারা চায় না তারা বিরোধীতা শুরু করবেই। না করলে বুঝতে হবে সেটা রসুল (সাঃ) এর ইসলাম নয়। এই কাজটির গুরুত্ব এত বেশী যে আল্লাহ সকল গোনাহ মাফ করে জান্নাতে দাখিল করতে চেয়েছেন। এই প্রসংগে সুরা আস সফের ১০-১২ তিনটি আয়াতের তরজমা পড়ে নিও। উক্ত আয়াতে বলা হয়েছে দ্বীন প্রতিষ্ঠা করার কাজটি করলে কঠিন আযাব থেকে রক্ষা করা হবে। ১২নং আয়াতে বলা হয়েছে এ কাজের বিনিময়ে গুনাহ খাতা মাফ করে দেয়া হবে এবং শুধু তাই নয় জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে। অর্থাৎ গুনাহ মাফ হয়ে যাওয়ার পর সরাসরি জান্নাতে। এ কাজ না করলেও জান্নাতে যাওয়া যাবে না তা নয়, তবে বিশেষ একটি শতের্, তা হলো জাহান্নামের আযাব ভোগ করার পর। রসুল (সাঃ) বলেন, যার বিন্দু পরিমান ঈমান আছে সেও একদিন জান্নাতে যাবে। এখানে সরাসরি বলা হয়নি, একদিন যাবে। অর্থাৎ যার যেমন গোনাহ তার তেমন শাস্তি ভোগ করে। তা হাজার হাজার লক্ষ কোটি বছরও হতে পারে। সরাসরি জান্নাতে প্রবেশ করানোর যে ওয়াদা আল্লাহর পক্ষ থেকে রয়েছে সেই কাজটিই হলো দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য প্রানান্তকর প্রচেষ্টা চালানোর কাজ। কোরআনের ভাষায় জিহাদ।

প্রশ্ন ঃ আচ্ছালামু আলাইকুম। মুন্সী সাহেব রোহিঙ্গাদের উপর যে নির্যাতন চলছে তাতে আমরা মর্মাহত। তাদের ব্যাপারে জাতি সংঘের ভূমিকা প্রশ্নবিধ। তাদের উপর নির্যাতন বন্ধে কি করণীয় আছে বলে মনে করেন। সালাউদ্দিন শাহীন, প্রবাসী, জর্ডান।
উত্তর ঃ তারা অন্য দেশের অধিবাসী। আমরা সেখানে যেতে পারছিনা। বিশ্ব জনমত গঠন করার জন্যে যেখানে যতটুকু সম্ভব বিশেষ করে ইলেট্রনিক মিডিয়া, সংবাদপত্র নানা যোগাযোগের মাধ্যমে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেয়া। যারা স্মরনার্থী এসেছে তাদের সাহায্য করা। বাংলাদেশ সরকারকে তাদের প্রতি সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দিতে আবেদন জানানো। পরিশেষে আল্লাহর কাছে দোয়া করা।

প্রশ্ন ঃ আচ্ছালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল­াহ। মুন্সী সাহেব আমাদের অভিভাবকরা মাদ্রাসার লেখাপড়া নিয়ে মতানৈক্য গড়ে তোলেন। কওমী মাদ্রার ইল্ম সহীহ। না আলিয়া মাদ্রাসার ইল্ম সহীহ? অনেকেই কওমী মাদ্রাসা স্থাপনের ইতিহাস পুরাতন বলে এ মাদ্রাসার ইল্মই সহীহ বলে সন্তানদের কওমীয়া মাদ্রাসায় লেখাপড়া করিয়ে থাকেন। আসলে কোন মাদ্রাসার ইলম সহীহ ও ভালো। কওমী ও আলিয়া মাদ্রাসার ইতিহাস জানতে চায়। জাকারিয়া, চুড়ামনকাঠি, যশোর।
উত্তর ঃ ইংরেজরা পাক-ভারত উপমহাদেশের শাসন শুরু করার পর মুসলমানদের শিক্ষা ব্যবস্থায় চরম অবনতি দেখা দেয়। তখন এদেশের আলেম উলামারা বিভিন্ন উপায়ে ইসলামী শিক্ষা চালু রাখেন। তাদের প্রচেষ্টায় অন্যতম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দেওবন্দ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। এই প্রতিষ্ঠানটি কুরআন, হাদিস,ফেকাহ ইত্যাদি শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠে এবং আজ পযর্ন্তও পাক-ভারত উপমহাদেশে বিশেষ করে বাংলাদেশের আনাচে কানাচে তাদের আদলে হাজার হাজার কওমী মাদ্রাসা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। আলিয়া মাদ্রাসা অষ্ট্রাদশ শতকের মধ্যবর্তী সময়ে ইংরেজদের পৃষ্ঠ পোষকতায় কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয়। এর সিলেবাস মূলত: তাদের ইচ্ছানুযায়ী তৈরি হয়। কুরআন-হাদিসের যে বিষয়গুলিতে রাজ্য শাসন, বিচারনীতি, ইসলামী অর্থনীতি, সমাজনীতি, ব্যবসা-বানিজ্য, বৈদেশিকনীতি ইত্যাদি ছিল তার প্রায় সবটুকুই বাদ রাখা হয়। সিলেবাসের মধ্যে প্রধান বিষয়গুলো বিশেষ করে বিয়ে, তালাক,জানাজা, নামাজ,রোজা, হজ্জ, যাকাত, দোয়া-দরুদ, ইবাদত এই বিষয়গুলো প্রাধান্য পায় বেশী। এর মুল কথা হলো ইসলামী শাসন ব্যবস্থার মধ্যে রাষ্ট্র কর্তৃক জনগন যে সুশাসনের মাধ্যমে কল্যাণ লাভ করতে পারে সে বিষয় মুসলমানদের বুঝতে না দেয়া। তাহলে ইংরেজরা বাধাহীন অবস্থায় পাক-ভারত শাসন করার সুযোগ হারাবে। এটাই ছিল তাদের মূখ্য চিন্তা। বাংলাদেশে গত শতাব্দীর আশির দশক থেকে আলিয়ার শিক্ষা ব্যবস্থায় সংকীর্ণতা কেটে যেতে থাকে। এ শিক্ষা ব্যবস্থায় ইসলামের সাথে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের সমন্বয় ঘটানো হয়। ইতিপূর্বে কামিল পরীক্ষার মান মার্স্টাস এর সম মর্যাদায় ছিল না। কামিলের 16807578_1460853463948589_8148002071963892603_nসার্টিফিকেট মাদ্রাসা বোর্ড থেকে দেয়া হতো। ২০০৫ সালে জোট সরকারের সময় কামিলের মান মাস্টার্স এর সমমর্যাদায় উন্নিত করা হয় এবং তাদের পরীক্ষা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তক গৃহীত হওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। ইসলামী ও আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার সমন্বয় হওয়ার কারণে আলিয়ার মেধাবী ছাত্ররা এখন সমাজের ও দেশের সকল স্তরে চাকুরী ও খেদমত করার সুযোগ পাচ্ছে। এই সুযোগটা কওমী মাদ্রাসা পাচ্ছে না। কারণ তাদের শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান বিষয়ক শিক্ষার কোন সমন্বয় ঘটানো হয়নি। দুটি শিক্ষা ব্যবস্থাই ভাল মানুষ তৈরী করছে। তবে একটির ছাত্রদেরকে দেশের সকল স্তরে যেভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে অন্যটির সেভাবে যাচ্ছে না।

প্রশ্ন ঃ আচ্ছালামু আলাইকুম। জনাব মুন্সী সাহেব বেধর্মীদের অনেকেরই লাশ না পুড়িয়ে মাটি চাপা দেয়। এতে নাকি তাদের গোর আজাব মাফ হবে। এতে কি তারা নাজাত পাবে। কায়সার আলী, খাগড়াছড়ি।
উত্তর ঃ ইসলামের দৃষ্টিতে বির্ধমীরা কি ঈমানদার ? যদি না হয় তাহলে আযাব মাফ পাওয়ার কোন প্রশ্ন আছে ?মাফ পেতে হলে ঈমান থাকতে হবে।

প্রশ্ন ঃ আচ্ছালামু আলাইকুম। ফারাজী মুন্সী সাহেব দাড়ী কামানো লোকের পেছনে নামাজ হবে কিনা? অনেক আলেম বলে দাড়ি ছাটাও হারাম। এদের পেছনেও নামাজ হয়না। দাড়ি রাখার শরীয়তের বিধান কি? খাকছার আলী, ময়মনসিংহ।
উত্তর ঃ দাড়ি ছাটা হারাম নয়। দাড়ি মন্ডন করা অর্থাৎ চেঁচে ফেলা না জায়েজ। দাড়ি রাখা ছুন্নাত। নামায না হওয়ার যে শর্ত আছে তার মধ্যে এটা পড়ে না। খেয়াল করতে হবে, সহীহ তেলওয়াত নামায হওয়ার প্রধান শর্ত। একজন দাড়ি রেখেছে তেলওয়াত সহীহ না। আর একজনের দাড়ি নেই তার তেলওয়াত সহীহ। দাড়িওয়ালা দাড়ি রেখে সুন্নাত পালন করেছে কিন্তু তেলওয়াত সহীহ না করে ফরজ লংঘণ করে। দ্বিতীয় জন দাড়ি না রেখে সুন্নাত লংঘণ করে কিন্তু তেলওয়াত সহীহ করে ফরজ পালন করে। এ ক্ষেত্রে দাড়ি না রাখার পেছনে দাড়িওয়ালার নামায না হওয়ার কোন যুক্তি নেই। কিন্তু যদি দু’টি শর্ত পালন করার মত কেউ থাকে তবে তাকেই ইমামের দায়িত্ব পালনে তাকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে।

প্রশ্ন ঃ আচ্ছালামু আলাইকুম। ফারাজী মুন্সী সাহেব বাংলাদেশের ভবিষৎ কোন দিকে? আমিরুল ইসলাম, জলঢাকা, ঢাকা।
উত্তর ঃ পৃথিবী, গ্রহ, নক্ষত্র এমনকি মহাবিশ্ব সকলেই ছুটছে কিয়ামাতের দিকে অর্থাৎ এদের সকলেরই একদিন ধংশ হবে। বাংলাদেশ পৃথিবীর একটা অতি ক্ষুদ্র অংশ, সে কি আর বেঁচে থাকতে পারবে ?

প্রশ্ন ঃ আচ্ছালামু আলাইকুম। মুন্সী সাহেব মোরগের অন্ডকোষ খাওয়া জায়েজ আছে কিনা? আমার দাদা একটি রোগের জন্য মোরগের হোল খেতে বলেছেন আসলে এতে কাজ হয় কিনা? তিতাস রহমান, গাড়াগঞ্জ, ঝিনাইদহ।
উত্তর ঃ হুঁ, জায়েজ। যার ভেতর গবর থাকে সেই গুরুর ভূড়ি খাওয়া যদি জায়েজ হয়, মোরগের গু-এর থলির যাকে গিলা বলে তা যদি খাওয়া জায়েজ হয় তবে তার অন্ডকোষ খাওয়াতে দোষ কি ?

প্রশ্ন ঃ আচ্ছালামু আলাইকুম। মুন্সী সাব নাপাক অবস্থায় খালি পায়ে হাঁটা জায়েজ আছে কিনা? রবি, বরগুনা।
উত্তর ঃ হ্যাঁ, জায়েজ। খালি পায়ে কেন ? জুতা পায়ে, স্যান্ডেল পায়ে, চটি পায়ে, খড়ম পায়ে,মোজা পায়ে মাটিতে পা রেখে না রেখে সকল অবস্থায় জায়েজ আছে।

প্রশ্ন ঃ আচ্ছালামু আলাইকুম। মুন্সী সাহেব আমাদের বাড়িতে কিছু গাছে ফর ধরে না। আমার দাদী এবার সেসব গাছে দড়ি, বিছালী, শামুক, হাড়ী বেঁধে দিয়েছেন। দাদী বললেন এগুলো দিলে ফল ধরে। আসলে এর কোন ভিত্তি আছে কিনা? নাছির উদ্দিন, তারাগুনিয়া,দৌলতপুর, কুষ্টিয়া।
উত্তর ঃ না, এর কোন ভিত্তি নেই। সম্পূর্ন না জায়েজ গোনাহর কাজ। আল্লাহর উপর আস্থা থাকে না বলে বোধশক্তি হীন লোকেরা এমনটি করে। এটা এক প্রকারের শিরক। শিরকের গোনাহ কঠিন। আল্লাহ নিজেই বলেছেন, তিনি শিরকের গোনাহ মাফ করবেন না।

আজকের মত এখানেই ।

ওয়াসসালাম।

shohag
By shohag February 28, 2017 15:53 Updated