শিরোনাম

কুষ্টিয়ার কুমারখালীর শিক্ষা ব্যবস্থার একাল-সেকাল

kumarkhali pilot schoolমাহমুদ শরীফ
কুমারখালীর শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে যাদের অবদান স্মরনীয় তাদের মধ্যে অন্যতম হলো- ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পূর্বে কুমারখালী উপজেলায় শিক্ষানুরাগী মথুরানাথ কুন্ডু (১৮১৮-১৮৮৫) কুমারখালী শহরের গড়াই নদীর তীরবর্তী নীলকুঠিবাড়ীতে ১৮৫৬ সালে তার নিজ নামে এম এন (মথুরানাথ) স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। মূলতঃ এটি ছিল একটি ইংরেজী বিদ্যালয়। তিনি এই স্কুল প্রতিষ্ঠালগ্নে লর্ড সাহেবের আগমন উপলক্ষে গড়াই নদীতে ব্যারিকেট দেন। জানা যায়, বাধ্য হয়ে লর্ড সাহেব তার স্কুল পরিদর্শন করেন। ১৮৬৩ সালে শিক্ষানুরাগী, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, সমাজসেবক সাধক কাঙাল হরিনাথ মজুমদার (১৮৩৩-১৮৯৬) নিজ উদ্যোগে কুমারখালীতে একটি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯২২ সালে বাবু জগেন্দ্রনাথ কুন্ডু তার নিজের নামে প্রতিষ্ঠা করেন কুমারখালী জে এন স্কুল। এর পর থেকে কুমারখালী উপজেলায় বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গের সহযোগীতায় আরো বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের আত্মপ্রকাশ ঘটে। এর মধ্যে ১৯৫৭ সালে পান্টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ১৯৬২ সালে যদুবয়রা মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ১৯৬৩ সালে মধুপুর হাইস্কুল যা বর্তমানে কলেজিয়েট স্কুলে উন্নীত হয়েছে, ১৯৬৪ সালে দক্ষিন মনোহরপুর হাইস্কুল, ১৯৬৭ সালে শহরতলীর দুর্গাপুরে শামসুদ্দিন আহমাদ মাষ্টারের প্রচেষ্টায় দূর্গাপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাসহ বর্তমানে কুমারখালী উপজেলায় ৮টি জুনিয়র হাইস্কুল, ৪৩টি মাধ্যমিক স্কুল, ২০টি মাদ্রাসা, ৬টি ডিগ্রী কলেজ, ১টি বিশ^বিদ্যালয় কলেজ, যা সম্প্রতি সরকারীকরণ করা হয়েছে। ১টি বিএড কলেজ, ১টি কৃষি কলেজ, ১টি বিপিএড কলেজ ও ১টি বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজ মিলে এই দুই স্তরে মোট বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৮২টি। প্রাথমিক স্তরে সরকারি ১৩৩টি ছাড়াও কমিউনিটি বিদ্যালয় রয়েছে ৮টি। সব মিলে কুমারখালী উপজেলা প্রায় ৪৩০ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে যাচ্ছে। এছাড়াও ইফার ১২০টি মসজিদভিত্তিক প্রাক-প্রাথমিক, নূরানী এবং বয়স্ক বিদ্যালয় শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে। অন্যদিকে উপজেলায় কিন্ডারগার্টেন বিদ্যালয় রয়েছে প্রায় ২ডজন।

সমগ্র উপজেলার মধ্যে জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষায় বরাবরই ভালো ফলাফল করে থাকে এম এন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, সুলতানপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়, বাঁশগ্রাম মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কুমারখালী বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও পান্টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়। ১৯৪৭ সালের পর প্রথম দিকে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়গুলোর প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে মুসলমানদের থেকে হিন্দুদের অবদান বেশি লক্ষ করা যায়। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর কুমারখালী উপজেলায় একক মুসলিম ব্যক্তির অনুপ্রেরণায় যে প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিষ্ঠিত হয় তার মধ্যে ১৯৭৫ সালে পাথরবাড়িয়া মজিবর রহমান মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ১৯৮৩ সালে আলাউদ্দিন আহমেদ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, দেশ স্বাধীনের পর এ্যাডঃ আব্দুল বারী বাঁশগ্রাম স্কুল, ১৯৯৯ সালে শিক্ষানুরাগী আব্দুল মজিদ নিজ গ্রামে জোতমোড়া বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন, যা যদুবয়রা ইউনিয়নের একমাত্র বালিকা বিদ্যালয়। পরবর্তী পর্যায়ের বছরগুলোতে শিলাইদহের আকমল হোসেন দাখিল মাদ্রাসা, আতিয়ার রহমান মাধ্যমিক বিদ্যালয়, বাঁখই মহব্বতপুরে রাগীব হাসান বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজ, ভালুকায় শেখ সদর উদ্দিন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়, চড়াইকোলে আলাউদ্দিন আহমেদ ডিগ্রী কলেজ, বাহার কৃষি কলেজ, আলাউদ্দিন আহমেদ বিএড কলেজসহ বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে।
কুমারখালী উপজেলায় নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ার ক্ষেত্রে বর্তমান সংসদ সদস্য আব্দুর রউফের ব্যাপক ভুমিকা রয়েছে। ৯০-এর দশকে তিনি এলাকায় শিক্ষা বিস্তারের জন্য বহু প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে যে ভুমিকা রেখেছেন তার উপহার স্বরূপ আজ তিনি জনপ্রিয় নেতা হিসেবে খ্যাতি পেয়েছেন। উপজেলা চেয়ারম্যান থেকে বর্তমানে তিনি সংসদ সদস্য হওয়ার যে গৌরব অর্জন করেছেন তার মূলে রয়েছে মূলতঃ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ার অন্যতম কারণ। কুমারখালী তথা কুষ্টিয়াবাসী শিক্ষানুরাগী আব্দুর রউফের শিক্ষা ক্ষেত্রে ভুমিকার কথা ইচ্ছা করলেও কোনদিন ভুলতে পারবেনা। উল্লেখ্য, পাথরবাড়ীয়া মজিবর রহমান মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি কুমারখালী উপজেলার প্রথম মুসলিম ব্যক্তির নামে প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সম্প্রতি আরেকজন শিক্ষানুরাগী শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান রাখতে শুরু করেছেন। তিনি হচ্ছেন যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা সমাজসেবক দানবীর জয়নাল আবেদীন। বর্তমানে কুমারখালীর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তার অর্থায়নে মনোরম গেট, ভবন, প্রাচীর, শহীদ মিনার, ফ্যান, চেয়ার, টেবিল, আলমারী, বেঞ্চ দেখা যাচ্ছে। তিনি গত বছরে ধর্মপাড়ায় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন। কুমারখালীর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তথা শিক্ষার সাথে জড়িত ব্যক্তিরা এই জয়নাল আবেদিন শিক্ষানুরাগীকে ভবিষ্যতের কুমারখালীর শিক্ষা তথা সমাজ উন্নয়নের বড় কান্ডারী হিসেবে ভাবতে শুরু করেছেন।

এদিকে দুঃখ ও কষ্টের কথা হচ্ছে, কুমারখালী উপজেলার বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আজও এমপিও ভুক্ত করা হয়নি। ননএমপিও ভুক্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং কর্মচারীরা বেতন ভাতা না পাওয়ায় চরম দুঃখ কষ্টের মধ্যে দিনানিপাত করছেন। উপজেলার সোন্দাহ দাখিল মাদরাসা ২০১০ সালে এমপিও ভুক্ত করা হলেও পরে রাজনৈতিক কারণে বাতিল করা হয়। সে সময় আদালতে মামলা করা হলে সম্প্রতি মাদরাসার পক্ষে উচ্চ আদালত রায় দিয়েছে। সরকার ননএমপিও ভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এমপিও ভুক্ত করে এ সকল শিক্ষক-কর্মচারীদের দুর্ভোগ দুর্দশা লাঘব করবেন এ প্রত্যাশা সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট সবার। পাশাপাশি বর্তমান সরকার সারাদেশের সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো সরকারিকরণ করেছে সারা বাংলাদেশের শিক্ষকদের দাবির সাথে কুমারখালীর সকল শিক্ষক-শিক্ষিকা কর্মচারীও দাবী করছেন সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারিকরণ করা হোক।
এদিকে সুখের কথা হচ্ছে- প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নে উপজেলা চেয়ারম্যান আঃ মান্নান খান দুই বার দেশ সেরা উপজেলা চেয়ারম্যান হয়েছেন, যেটা আমাদের গর্বের বিষয়।
কুমারখালীতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বেড়ে বেকারদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে এটা সত্যিই সৌভাগ্যের কথা। দিন দিন কুমারখালীর শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটছে এটা অব্যাহত থাকুক এটাই প্রত্যাশা।

267 total views, 2 views today

121,941 total views, 722 views today

প্রধান খবর

  • আজ ৯ ডিসেম্বর কুমারখালী হানাদার মুক্ত দিবস

    কুমারখালি প্রতিনিধি : ১৯৭১ সালের ৯ ডিসেম্বর এই দিনে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে কুমারখালীর মুক্তিযোদ্ধারা বিজয় ছিনিয়ে এনেছিলেন এবং কুমারখালীকে হানাদার মুক্ত করেছিলেন।

    ১৯৭১ সালের ৭ ডিসেম্বর সকালে মুক্তিযোদ্ধারা পরিকল্পিত ভাবে কুমারখালীতে প্রবেশ করে শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত কুন্ডুপাড়ার রাজাকারদের ক্যাম্প আক্রমণ করেন। রাজাকার কমান্ডার ফিরোজ বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়।

    এ খবর কুষ্টিয়া জেলা শহরে অবস্থানরত পাক-সেনাদের কাছে পৌঁছালে তারা দ্রুত কুমারখালীতে এসে গুলিবর্ষণ করতে থাকলে পুরো শহর আতঙ্ক গ্রস্থ হয়ে পড়ে। এবং মুক্তিযোদ্ধারা তাদের অkkkkপর্যাপ্ত অস্ত্র ও সংখ্যায় কম থাকায় শহর ত্যাগ করেন।

    এ সময় পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকাররা কুমারখালী শহরজুড়ে হত্যাযজ্ঞ, অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজ শুরু করে।৭ ডিসেম্বরের যুদ্ধে পাকিস্তানী বাহিনীর হাতে আওয়ামী লীগ নেতা মুক্তিযোদ্ধা তোসাদ্দেক হোসেন ননী মিয়া শহীদ হন।
    পাকিস্তানী হানাদারদের হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়েছিলেন মুক্তিকামী বীর বাঙালী সামসুজ্জামান স্বপন, সাইফুদ্দিন বিশ্বাস, আব্দুল আজিজ মোল্লা, শাহাদত আলী, কাঞ্চন কুন্ডু, আবু বক্কার সিদ্দিক, আহমেদ আলী বিশ্বাস, আব্দুল গনি খাঁ, সামসুদ্দিন খাঁ, আব্দুল মজিদ ও আশুতোষ বিশ্বাস মঙ্গল।

    পরবর্তীতে মুক্তিযোদ্ধারা সুসংগঠিত হয়ে ৯ ডিসেম্বর পাকবাহিনীর ক্যাম্পে (বর্তমানে কুমারখালী উপজেলা পরিষদ) আক্রমণ করেন।

    দীর্ঘসময় যুদ্ধের পর পাকিস্তানি বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণের কাছে টিকতে না পেরে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায় । ৯ ডিসেম্বরের যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে রাজাকার কমান্ডার খুশি মারা যায়।

    এইদিন কুমারখালী শহর হানাদার মুক্ত হওয়ার পর সর্বস্তরের জনতা এবং মুক্তিযোদ্ধারা রাস্তায় নেমে আনন্দ মিছিল বের করেন।

    6,932 total views, 642 views today

আজকের খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : খালিদ হাসান সিপাই.

নির্বাহী সম্পাদক : মাজহারুল হক মমিন।

বড় জামে মসজিদ মার্কেট, এন এস রোড কুষ্টিয়া।

০১৭১৬২৬৮৮৫৮, E-mail: Kushtiardiganta@gmail.com .