শিরোনাম

ছেঁউড়িয়ায় সাধু-ভক্তদের মিলন মেলা

kushtia lalon sah majarস্টাফ রিপোর্টার : কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ার লালন আঁখড়াবাড়ীতে চলছে বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁইজির ১২৮ তম তিরোধান দিবস। মঙ্গলবার থেকে শুরু হয়েছে লালন সাঁইজির তিরোধান দিবস উপলক্ষ্যে তিন দিনব্যাপী আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও গ্রামীণ মেলা। অনুষ্ঠান চলবে ১৮ অক্টোবর বৃহস্পতিবার পর্যন্ত। এদিকে অনুষ্ঠান শুরুর আগে থেকেই লালন আঁখড়াবাড়ী উৎসবমূখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। সাধু-ভক্তদের মিলন মেলায় পরিনত হচ্ছে ছেঁউড়িয়ারার এই লালন আঁখড়াবাড়ী
সোমবার সকাল থেকেই দলে দলে সাধুরা আসে। সাধুরা এসে ইতিমধ্যেই শুরু করেছেন ক্ষুদ্র আসরে বাউলা গান। কেউ কেউ আবার গুরুর মুখে শুনছে দেহতত্বের কথা, জানার চেষ্টা করছে মানবজীবন সম্পর্কে। সব মিলিয়ে লালন আঁখড়াবাড়ীতে উৎসব প্রায় জমে উঠতে শুরু করেছে।
তার স্মরণে প্রতি বছর কুষ্টিয়ার ছেউড়িয়ায় ২টি উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। অত্যান্ত জাকজমকভাবে পালিত ওই ওই দুটি উৎসব। দেশ-বিদেশ থেকে হাজার হাজার বাউল বক্ত অনুসারী এখানে আসেন। একটি হচ্ছে স্মরণোৎসব আরেকটি  তিরোধান দিবস। এ দুটি উৎসব উপলক্ষে প্রতি বছরই সাঈজির টানে ছুটে আসেন লাখো বাউল ভক্ত অনুরাগীরা। সে সময় আধ্যাত্মিক সাধক বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহের মাজার লালন ভক্ত অনুরাগীদের মিলন মেলায় পরিণত হয়।  উৎসবকে ঘিরে কুষ্টিয়া কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় কালী নদীর পাড়ে সাধূ উৎসব শুরু হয়। উৎসবকে ঘিরে  বাউলদের  পদচারনায় মুখরিত হয়ে ওঠে লালন একাডেমীর বিশাল মাঠ । দেশী বিদেশী হাজারো ভক্তের পদচারণায় মুখরিত হয় বাউল সম্রাট লালন  সাঁইয়ের মাজার।  দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে লালন ভক্তরা লালন একাডেমী চত্বরে স্ব স্ব স্থানে আসন গেড়ে বসে। লালনের ভাব  গান আর লালনের বানী প্রচারে ব্যস্ত সময় কাটায় তারা।
সূত্রমতে, প্রায় ২শ বছর আগের কথা। পরিচয়হীন অসুস্থ্য ১০/১২ বছরের বালক লালনকে কুষ্টিয়ার কালিগাং নদীর ঘাট থেকে মাওলানা ফকির মলম শাহ তাকে উদ্ধার করে। পরে মলম শাহ তার বাড়ীতে অসুস্থ লালনকে চিকিৎসা ও সেবা করে সুস্থ করে তোলেন। লালন সুস্থ্য হয়ে উঠেই মলম শাহ’র বাড়ীতে আশ্রয় নেয়। সেখানে সে দিনে দিনে বড় হয়ে আধ্যাত্মিক সাধনা শুরু করেন। তার সাধনার মধ্যে ছিল শরীয়ত, মারফত, দেহতত্ব ও মানবতাবাদী। এ সময় বাউল সাধক ফকির লালন শাহ তার জীবন দশায় প্রতি বছর দোল পূর্ণিমায় তার ভক্তদের নিয়ে একটি অনুষ্ঠান করতেন। পরবর্তীতে বাংলা  ১২৯৭ সালের ১লা কার্তিক ইংরাজী ১৮৯০সালের ১৭ অক্টোবর বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ মৃত্যুবরন করেন।

বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ এর মৃত্যুর পর থেকেই তার অনুসারী ভক্তবৃন্দরা দোল পূর্নিমায় এই অনুষ্ঠান করে আসছে এবং এ অনুষ্ঠানের নাম দেয়া হয় লালন স্মরণোৎসব। সংস্কৃতিক বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগীতায় লালন একাডেমী কুষ্টিয়ার আয়োজনে লালন স্মরণোৎসব অনুষ্ঠিত হয়। লালন মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় লালনের জীবনীর উপর আলোচনা ও লালন সংগীত এবং মাঠে বসে গ্রামীণ মেলা। লালনের স্মরণ উৎসবকে ঘিরে কুষ্টিয়া মরা কালী গাঙের ধারে বসে ফকিরদের এ মিলন মেলা। এ উৎসবে ফকিরদের ব্যস্ততার যেন সীমা থাকেনা।
লালনের বানী ছড়িয়ে দিতেই প্রতি বছর লালন স্মরণোৎসবে উপস্থিত হয়ে অনেক কিছু শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে তার ভক্তরা এজন্যই তাদের আরাধনা বলে জানায় লালন ভক্তরা।
বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ তার জীবন দশায় দোল পূর্নিমার রাতে তার ভক্তদের নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও মত বিনিময়  করতেন। আলোচনার বিষয় বস্তু ঐ রাতেই তিনি বুঝতেন এবং পরবর্তী এক বছরের কর্ম পরিকল্পনা করতেন।
এ জন্যই ৫দিনের অনুষ্ঠানে লালন ভক্ত অনুসারী ও দর্শনার্থীদের লালনের বানী শুনানোর জন্য লালনের গান ও ভক্ত অনুসারীদের আপ্যায়নের ব্যবস্থা করা হয়। সারা বিশ্বের মানুষ আজ লালনকে নিয়ে গবেষনা করছে যা আমাদের গর্ব। দেশ বিদেশ থেকে আসা হাজার হাজার লালন ভক্ত অনুসারীরা সারা রাত লালনের বানী ও গান শুনে ভক্তি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
মানুষের পরিচয় জাত পাত ধর্মে নয়। আর এ মানুষকে ভালোবাসলেই পরমাত্মা তথা সৃষ্টিকর্তার নৈকট্য লাভ সম্ভবÑলালন দর্শনের এ মূলমন্ত্র । এ লক্ষ্যেই লাখো বাউল ভক্তদের মিলন মেলা বসেছে। লালন ভক্তদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনা বিরাজ করছে। লালনের অহিংস বাণী  সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়–ক এ প্রত্যাশা করেন বাউল ভক্তরা।
লালন গবেষকদের অভিমত, বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে এক অখন্ড ঐক্যসূত্রের বন্ধন এনে দিয়েছেন বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহের এই বাউল গান। বাউল ফকিররা জাতের বিচার করেননি। সবার উপর মানুষ সত্য এই বাণী মেনেছেন অমত্মর দিয়ে। তাঁরা সর্বশ্রেণীর সর্বজাতির মিলনসেতু। মানবিক আবেগ তাঁদের কাছে সব থেকে মূল্যবান। বাউল গানের সর্বশ্রেষ্ঠ রসশিল্পী ছিলেন মরমী সাধক ফকির লালন শাহ্। মরমী সাধক লালন শাহ আমাদের অহংকার। কুষ্টিয়াবাসী তথা এদেশ তাঁকে নিয়ে গর্ব করে। বাউল সাধনা একটি পরিপূর্ণ আধ্যাত্মিক সাধনা। বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে এই আধ্যাত্মিক সাধনাকে জীবন ও জগতের মুক্তির একমাত্র উপায়স্থল বলে ভেবেছেন। দীর্ঘকাল ধরে উপমহাদেশে বিশেষ করে বাংলাদেশের হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে যে ঐক্যসূত্র গড়ে উঠেছে তার মূলে বাউল গানের রচয়িতাদের অবদানই সর্বাধিক। দেশাচার, লোকাচার, শাস্ত্র কিংবা ধর্মীয় অনুশাসন এই সাধন পদ্ধতির সীমানাকে বেঁধে দিতে পারেনি। বাউল গান বাউল ফকিরদের সাধন-ভজনের সহায়ক। প্রায় পাঁচশো বছর ধরে বাংলায় বাউল গান রচিত এবং গীত হয়ে আসছে। লালন শাহ্ বা লালন ফকির ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী আধ্যাত্মিক সাধকদের অন্যতম। মরমী সাধক লালন শাহের গান সৃষ্টি এবং স্রষ্টার মধ্যে দারুনভাবে মিলন ঘটিয়েছে। তার সৃষ্টিকে ধরে রাখতে আজকের তরুনদের এগিয়ে আসতে হবে জানান লালন গবেষকরা। লালন শাহ একাধারে বাউল সাধক, বাউল গানের গীতিকার, সুরকার ও গায়ক। বাউল সম্রাট লালন শাহ্ প্রভাবিত করেছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকেও। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন,আমার অনেক গানেই আমি বাউলের সুর গ্রহণ করেছি এবং অনেক গানে অন্য রাগ-রাগিণীর সঙ্গে আমার জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে বাউল সুরের মিল ঘটেছে। তিনি আরো বলেন, লালনের গান মরমি ব্যঞ্জনা ও শিল্পগুণে সমৃদ্ধ। সহজ-সরল শব্দময় অথচ গভীর তাৎপর্যপূর্ণ তাঁর গানে মানব জীবনের আদর্শ, মানবতাবাদ ও অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পেয়েছে। ‘পাক্ষিক হিতকরী’ পত্রিকায় লিখা হয়েছিল,‘‘লালন নিজে কোন সাম্প্রদায়িক ধর্মাবলম্বী ছিলেন না; অথচ সকল ধর্মের লোকই তাঁকে আপন বলে জানত। লালন ফকিরের আবির্ভাব বাঙালি জাতীয় জীবনে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। আবহমানকাল ধরে ভারতীয় তথা বাংলার সংস্কৃতিতে যে মিলিত সাধনা চলে আসছিল সেই যুক্ত সাধনা লালনের গানে বিধৃত হয়ে আছে। অসাম্প্রদায়িক চেতনা, বর্ণবাদের প্রতি তীব্র বিরোধীতা এবং মানবিক মূল্যবোধের প্রতি তাঁর ছিল অগাধ বিশ্বাস। জাতিবোধের প্রতি তীব্র বিরোধীতা এবং সামাজিক মূল্যবোধ ও মুক্তব্্ুদ্ধর উন্মেষ ঘটিয়ে লালন ফকির তাঁর গানকে জনপ্রিয় করে তোলেন। তিনি বলেন, বাউল কবি হিসেবে লালনের দান অপরিসীম। তিনি বাউল শিরোমণি। তাঁর ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’ বাড়ির কাছে আরশী নগর’ আমার ঘরখানায় কে বিরাজ করে’ ইত্যাদি গান বাউল তত্ত্বসাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ এই লোককবিকে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। স্বীকার করেছেন মনীষী হিসেবে। লালন শাহের কবি প্রতিভা সর্বসম্প্রদায়ের, সর্বলোকের ও সর্বকালের, তিনি বরেণ্য। আজকের এই সময়ে লালনের আদর্শকে ব্যাপক মানুষের সামনে উপস্থাপন করা বড় বেশি জরুরী হয়ে পড়েছে। লালন ফকির শিখিয়ে দিয়ে গেছেন, মানবতার কোন বিকল্প নেই।

39 total views, 3 views today

121,934 total views, 715 views today

প্রধান খবর

  • আজ ৯ ডিসেম্বর কুমারখালী হানাদার মুক্ত দিবস

    কুমারখালি প্রতিনিধি : ১৯৭১ সালের ৯ ডিসেম্বর এই দিনে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে কুমারখালীর মুক্তিযোদ্ধারা বিজয় ছিনিয়ে এনেছিলেন এবং কুমারখালীকে হানাদার মুক্ত করেছিলেন।

    ১৯৭১ সালের ৭ ডিসেম্বর সকালে মুক্তিযোদ্ধারা পরিকল্পিত ভাবে কুমারখালীতে প্রবেশ করে শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত কুন্ডুপাড়ার রাজাকারদের ক্যাম্প আক্রমণ করেন। রাজাকার কমান্ডার ফিরোজ বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়।

    এ খবর কুষ্টিয়া জেলা শহরে অবস্থানরত পাক-সেনাদের কাছে পৌঁছালে তারা দ্রুত কুমারখালীতে এসে গুলিবর্ষণ করতে থাকলে পুরো শহর আতঙ্ক গ্রস্থ হয়ে পড়ে। এবং মুক্তিযোদ্ধারা তাদের অkkkkপর্যাপ্ত অস্ত্র ও সংখ্যায় কম থাকায় শহর ত্যাগ করেন।

    এ সময় পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকাররা কুমারখালী শহরজুড়ে হত্যাযজ্ঞ, অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজ শুরু করে।৭ ডিসেম্বরের যুদ্ধে পাকিস্তানী বাহিনীর হাতে আওয়ামী লীগ নেতা মুক্তিযোদ্ধা তোসাদ্দেক হোসেন ননী মিয়া শহীদ হন।
    পাকিস্তানী হানাদারদের হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়েছিলেন মুক্তিকামী বীর বাঙালী সামসুজ্জামান স্বপন, সাইফুদ্দিন বিশ্বাস, আব্দুল আজিজ মোল্লা, শাহাদত আলী, কাঞ্চন কুন্ডু, আবু বক্কার সিদ্দিক, আহমেদ আলী বিশ্বাস, আব্দুল গনি খাঁ, সামসুদ্দিন খাঁ, আব্দুল মজিদ ও আশুতোষ বিশ্বাস মঙ্গল।

    পরবর্তীতে মুক্তিযোদ্ধারা সুসংগঠিত হয়ে ৯ ডিসেম্বর পাকবাহিনীর ক্যাম্পে (বর্তমানে কুমারখালী উপজেলা পরিষদ) আক্রমণ করেন।

    দীর্ঘসময় যুদ্ধের পর পাকিস্তানি বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণের কাছে টিকতে না পেরে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায় । ৯ ডিসেম্বরের যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে রাজাকার কমান্ডার খুশি মারা যায়।

    এইদিন কুমারখালী শহর হানাদার মুক্ত হওয়ার পর সর্বস্তরের জনতা এবং মুক্তিযোদ্ধারা রাস্তায় নেমে আনন্দ মিছিল বের করেন।

    6,925 total views, 635 views today

আজকের খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : খালিদ হাসান সিপাই.

নির্বাহী সম্পাদক : মাজহারুল হক মমিন।

বড় জামে মসজিদ মার্কেট, এন এস রোড কুষ্টিয়া।

০১৭১৬২৬৮৮৫৮, E-mail: Kushtiardiganta@gmail.com .