শিরোনাম

বিশ্ব রেকর্ড সৃষ্টি করেছিলেন  কুষ্টিয়ার কানাই লাল শর্মা

kushtia kanilal sormaডা. কানাই লাল শর্মা। সাঁতারে বিশ্ব রেকর্ড সৃষ্টিকারী এক অদম্য সাঁতারু। ১৯৭১ সালে মুক্তিফৌজের সাহায্যার্থে ঐতিহাসিক লাল দিঘিতে ৯০ ঘণ্টা ১৭ মিনিট সাঁতার কেটে বিশ্ব রেকর্ড সৃষ্টি করেছিলেন ডা. কানাই লাল শর্মা। ১৯৩০ সালের ৭ নভেম্বর কুষ্টিয়ার হাটশ হরিপুর ইউনিয়নের শালদহ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার বাবা মৃত অভিমুন্য শর্মা। কানাইলাল শর্মা পেশায় চিকিৎসক। থাকেন কুষ্টিয়া শহরতলীর মঙ্গলবাড়ীয়া এলাকায়। সংসার জীবনে তিনি ৩ মেয়ে এবং ২ ছেলের জনক।

কানাই লাল শর্মার বয়স যখন ৫-৬ বছর। তখন একদিন তার বাবা নৌকায় করে গড়াই নদী পার হয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। ঝড়ে মাঝ নদীতে এসে নৌকাটি ডুবে যায়। এতে অনেকেই মারা যায়। সৌভাগ্য বসত কানাই লাল শর্মার বাবা অভিমুন্য শর্মা প্রাণে বেঁচে যান।

নদীতে নৌকা ডুবেছে শুনে চারিদিকে কান্নার রোল পড়ে। কানাই লালকে কোলে নিয়ে তার দিদিমা নদীর ঘাটে আসেন। চারিদিকে মৃত্যুর কান্না। অনেকক্ষণ পরে আসেন অভিমুন্য শর্মা। নদীর ঘাটে তখনও অপেক্ষা করছে অভিমুন্যর মা। অভিমুন্য তার মায়ের কাছ থেকে কানাই লাল শর্মাকে কোলে নেন। অভিমুন্য তার মাকে বলেন, মা কানাই যেন ভালো করে সাঁতার শেখে। সেই থেকে কানাই লাল সাঁতার শিখতে থাকে। আর সেখান থেকেই সাঁতার শেখার যাত্রা শুরু। এর কিছুদিন পর কানাই লাল শর্মার মা শান্তি বেলা শর্মা কলেরায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায়।

১৯৪৪ সালে পুরাতন কুষ্টিয়া এম ই স্কুলে কানাই ভর্তি হন। তার প্রথম শিক্ষক ঝুমুর পণ্ডিত। পড়ালেখার ব্যাপারে তার অভিভাবক ছিলেন একই এলাকার দিদার বক্স মণ্ডল। পড়ালেখার পাশাপাশি কানাই লাল সাঁতার শিখতে থাকেন।

হঠাৎ করে ভারতে বেড়াতে যান কানাই লাল। এ সময় পশ্চিম বঙ্গের হুগলি ব্রিজ থেকে নৈহাটি ফেরি ঘাট পর্যন্ত ৩ মাইল সাঁতার প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে বলে জানতে পারেন। পরে সেখানে নাম লেখিয়ে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন কানাই লাল। ৭০ জন প্রতিযোগির মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেন কানাই লাল। অর্জন করেন সোনার মেডেল। শুরু হয় কানাই লাল শর্মার সাঁতারের কৃতিত্ব।

এরপর ১৯৪৮ সালে কবি আজিজুর রহমানের পুকুরে ২৫ জন প্রতিযোগির মধ্যে সাঁতার কেটে প্রথম স্থান অধিকার করেন সাঁতারু কানাই লাল শর্মা। কবি নিজ হাতে কানাই লালকে পুরস্কার তুলে দেন এবং আশীর্বাদ করেন। এরপর ১৯৫৯ সালে নওরোজ ক্লাবের আয়োজনে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ থেকে গড়াই ব্রিজ পর্যন্ত ২০ মাইল সাঁতার প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে প্রথম হন তিনি। ১৯৬০ সালের ১৪ আগস্ট কেডিএসের আয়োজনে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ থেকে গড়াই ব্রিজ পর্যন্ত সাঁতার প্রতিযোগিতায় প্রথম হন তিনি।

সাঁতার দেখার জন্য এ সময় উপস্থিত ছিলেন দেবী প্রসাদ চক্রবর্তী (কানু বাবু) সহ সুধী মহল এবং বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। ওই সালেই কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের আয়োজনে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ থেকে গোয়ালন্দ ঘাট পর্যন্ত সাঁতার প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। আয়োজক কমিটির মধ্যে ছিলেন ডা. তোফাজ্জল হক, ডা. নিত্য বাবু, কলেজের অধ্যক্ষসহ কলেজ কর্তৃপক্ষ। প্রতিযোগিতার ৪ দিন পর হয় অনুষ্ঠান। কিন্তু দুঃখজনক হলেও তখন পুরস্কার দেয়া হয়নি। পরে দেয়া হবে বলে জানান কলেজ কর্তৃপক্ষ।

এর কিছুদিন পরে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ থেকে গোয়ালন্দ ঘাট পর্যন্ত সাঁতার দেয়ার কারণে কুষ্টিয়া মোহিনী মোহন বিদ্যাপীঠ মাঠে পুরস্কার দেয়ার আয়োজন করা হয়। সেখানে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর আজম খান আসেন। কানাই লাল সরকারি কলেজের ছাত্র হওয়ায় আজম খান সেখানে অনুদান দেন। তবে সরকারি কলেজ থেকে আজও তার পুরস্কারের ব্যবস্থা করা হয়নি। এরপর তিনি ঢাকা ব্রজেন দাশের কাছে সাঁতার শিখতে যান। পরিবেশ না থাকায়, চলে যান ব্রজেন দাশের ওস্তাদের কাছে কলকাতায়।

কলকাতার শৈলেন্দ্র মেমোরিয়াল ক্লাবের কোচ প্রফুল্ল ঘোষ, বোজো গোপাল পাইন ও পণ্ডিত মশায়ের কাছে সাঁতার শিখতে থাকেন কানাই লাল শর্মা। সেখানে ৬ মাস সাঁতার শেখার পর ৩৬ ঘণ্টা ৪ মিনিট সাঁতারে ভারতীয় রেকর্ড ভঙ্গ করেন সাঁতারু কানাই লাল শর্মা। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকাতেও খবরটি ফলাও করে প্রকাশ করা হয়। এরপর সেখানে বিভিন্ন সময় সাঁতার দিয়ে ৮৪টি গেমসে প্রথম হন তিনি। এরপর চলে এলেন নিজ দেশে। দেশে এসে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ থেকে কুষ্টিয়া অংশের পদ্মা নদীতে এপার ওপার হয়ে সাঁতার দেন। তারপর ১৯৬২ সালে সরকারি কলেজের পক্ষ থেকে ৫২ মাইল সাঁতার প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন তিনি। নারায়ণগঞ্জ থেকে চাঁদপুর পর্যন্ত সাঁতার দিয়ে তৃতীয় স্থান অধিকার করেন।

এরপর দাউদকান্দি থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত ৪০ কি.মি. সাঁতার দিয়ে তৃতীয় স্থান অধিকার করেন। কুষ্টিয়ায় ৫০ ঘণ্টা, দৌলতপুরে ৬০ ঘণ্টা ও খোকসায় ৬০ ঘণ্টা সাঁতার কাটেন তিনি। ১৯৭১ সালের ২৭ জুলাই ভারতে যান কানাই লাল। আমেরিকান সাঁতারু মি. জন ভিসিকমেন্টের প্রতিষ্ঠিত বিশ্ব রেকর্ড ৮৯ ঘণ্টা ৩২ মিনিটকে অতিক্রম করেন কানাই লাল। তিনি ঐতিহাসিক লাল দিঘিতে মুক্তি ফৌজের সাহায্যার্থে ১৯৭১ সালের ২৩ আগস্ট থেকে ২৭ আগস্ট পর্যন্ত ৯০ ঘণ্টা ১৭ মিনিট সাঁতার কেটে বিশ্ব রেকর্ড সৃষ্টি করেন। এটাই হয় তার জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন। বিশ্ব রেকর্ড সৃষ্টিকারী সাঁতারু হিসেবে নাম লেখান ডা. কানাই লাল শর্মা। এ সময় ভারতের লে. জেনারেল অরোরা উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন ব্যারিস্টার এম আমির-উল ইসলামসহ বিভিন্ন ব্যক্তিরা।

১৯৮০ সালে কানাই লাল শর্মা ৩৫০ কি. মি. সাঁতার কাটেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের চৌডালা থেকে গোয়ালন্দ পর্যন্ত ৩৫০ কি. মি. সাঁতার কাটেন। এরপর ১৯৯৭ সালে তিনি বয়স্কদের সাঁতার প্রতিযোগিতায় বিশ্ব রেকর্ড সৃষ্টি করেন। যমুনা সেতুর পাশে ভুয়াপুল ঘাট থেকে আরিচা ঘাট পর্যন্ত ৯০ কি. মি. সাঁতার প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন। এভাবে জীবনের বিভিন্ন সময় সাঁতার কেটেছেন অধ্যাপক ডা. কানাই লাল শর্মা। এখন জীবন সায়াহ্নে এসে গিনেস বুকে নাম লেখাতে চান এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাক্ষাৎ পেতে চান কানাই লাল শর্মা।

বয়সের ভারে ন্যুব্জ কানাই লাল শর্মা তার অর্জনের স্বীকৃতি দাবি করেন। সেই সঙ্গে তিনি জীবনের শেষ বয়সে এসে হলেও বিশ্ব সেরা প্রবীণ সাঁতারুর দেশ হিসেবে বাঙালির মর্যাদা বৃদ্ধির স্বপ্ন দেখেন।

কানাই লাল শর্মা জানান, তিনি কালেক্টরেটে চাকরি করতেন। স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করায় ১৯৭২ সালে চাকরিচ্যুত হন। এমনকি যুদ্ধ চলাকালীন ৯ মাসের বেতনও দেয়া হয়নি তাকে। তৎকালীন জেলা প্রশাসক তার বিশ্ব রেকর্ড সৃষ্টির জন্য গিনেস বুকে নাম লেখানোর চেষ্টা করলেও অজ্ঞাত কারণে তা আজও হয়নি। জীবনের শেষ বয়সে এসে তিনি তার অধিকার-মর্যাদা ফিরে পেতে চান। তার ইচ্ছা বাংলাদেশকে বিশ্ব সেরা প্রবীণ সাঁতারুর দেশ ও ১৯৭১ সালের ২৭ আগস্টকে স্মরণ করে ওই দিনকে বিশ্ব ক্রীড়া দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে বাঙালির মর্যাদা বৃদ্ধি করা। চান সরকারি ভাবে এর স্বীকৃতি। শেষ জীবনে এমনটি প্রত্যাশা করেন ডা. কানাই লাল শর্মা।

230 total views, 2 views today

121,893 total views, 674 views today

প্রধান খবর

  • আজ ৯ ডিসেম্বর কুমারখালী হানাদার মুক্ত দিবস

    কুমারখালি প্রতিনিধি : ১৯৭১ সালের ৯ ডিসেম্বর এই দিনে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে কুমারখালীর মুক্তিযোদ্ধারা বিজয় ছিনিয়ে এনেছিলেন এবং কুমারখালীকে হানাদার মুক্ত করেছিলেন।

    ১৯৭১ সালের ৭ ডিসেম্বর সকালে মুক্তিযোদ্ধারা পরিকল্পিত ভাবে কুমারখালীতে প্রবেশ করে শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত কুন্ডুপাড়ার রাজাকারদের ক্যাম্প আক্রমণ করেন। রাজাকার কমান্ডার ফিরোজ বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়।

    এ খবর কুষ্টিয়া জেলা শহরে অবস্থানরত পাক-সেনাদের কাছে পৌঁছালে তারা দ্রুত কুমারখালীতে এসে গুলিবর্ষণ করতে থাকলে পুরো শহর আতঙ্ক গ্রস্থ হয়ে পড়ে। এবং মুক্তিযোদ্ধারা তাদের অkkkkপর্যাপ্ত অস্ত্র ও সংখ্যায় কম থাকায় শহর ত্যাগ করেন।

    এ সময় পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকাররা কুমারখালী শহরজুড়ে হত্যাযজ্ঞ, অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজ শুরু করে।৭ ডিসেম্বরের যুদ্ধে পাকিস্তানী বাহিনীর হাতে আওয়ামী লীগ নেতা মুক্তিযোদ্ধা তোসাদ্দেক হোসেন ননী মিয়া শহীদ হন।
    পাকিস্তানী হানাদারদের হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়েছিলেন মুক্তিকামী বীর বাঙালী সামসুজ্জামান স্বপন, সাইফুদ্দিন বিশ্বাস, আব্দুল আজিজ মোল্লা, শাহাদত আলী, কাঞ্চন কুন্ডু, আবু বক্কার সিদ্দিক, আহমেদ আলী বিশ্বাস, আব্দুল গনি খাঁ, সামসুদ্দিন খাঁ, আব্দুল মজিদ ও আশুতোষ বিশ্বাস মঙ্গল।

    পরবর্তীতে মুক্তিযোদ্ধারা সুসংগঠিত হয়ে ৯ ডিসেম্বর পাকবাহিনীর ক্যাম্পে (বর্তমানে কুমারখালী উপজেলা পরিষদ) আক্রমণ করেন।

    দীর্ঘসময় যুদ্ধের পর পাকিস্তানি বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণের কাছে টিকতে না পেরে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায় । ৯ ডিসেম্বরের যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে রাজাকার কমান্ডার খুশি মারা যায়।

    এইদিন কুমারখালী শহর হানাদার মুক্ত হওয়ার পর সর্বস্তরের জনতা এবং মুক্তিযোদ্ধারা রাস্তায় নেমে আনন্দ মিছিল বের করেন।

    6,885 total views, 595 views today

আজকের খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : খালিদ হাসান সিপাই.

নির্বাহী সম্পাদক : মাজহারুল হক মমিন।

বড় জামে মসজিদ মার্কেট, এন এস রোড কুষ্টিয়া।

০১৭১৬২৬৮৮৫৮, E-mail: Kushtiardiganta@gmail.com .