ঢাকাThursday , 18 August 2022
  1. epaper
  2. অর্থনীতি
  3. আইন ও অপরাধ
  4. আন্তর্জাতিক
  5. ইতিহাস ঐতিহ্য
  6. ইসলামি দিগন্ত
  7. কুষ্টিয়ার সংবাদ
  8. কৃষি দিগন্ত
  9. খেলাধুলা
  10. গণমাধ্যম
  11. জনদূর্ভোগ
  12. জাতীয়
  13. জেলার খবর
  14. তথ্য প্রযুক্তি
  15. দিগন্ত এক্সক্লুসিভ

পড়ুয়া

admin
August 18, 2022 11:46 am
Link Copied!

মাহমুদ শরীফ

ফরহাদ হোসেন যেন বড্ড বিপদে পড়লেন। বিপদই বটে। কেননা, ব্যস্ত মহানগরী ঢাকাতে বহিরাগতদের ক্ষেত্রে নানাবিধ অসুবিধার মধ্যে টাকার নোট ভাংতি করা একটা বড় বিপদ না হলেও চরম অসুবিধা বৈকি! কারো কাছে টাকার নোট ভাংতিটা চাওয়া যেন অন্যায় আর অপরাধের মত কিছু। ফরহাদ সাহেব দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছেন- কোথায় শত টাকার নোটটা ভাংতি পাওয়া যায়? ওদিকে রিকসাওয়ালা বার বার তাগাদা দিচ্ছে টাকা নিয়ে সরে যাওয়ার জন্য।

অবসরপ্রাপ্ত বৃদ্ধ শিক্ষক ফরহাদ সাহেব ৫০ টাকা ভাড়া মিটিয়ে গুলিস্থান থেকে মগবাজার এসেছেন। দুর সম্পর্কের এক ভাতিজার বাসায় উঠবেন। কাল সকালে শিক্ষা ভবনে যাবেন তিনি। রিকসাওয়ালার কাছে নাকি ভাংতি টাকা নেই। থাকলেও বেশি নেওয়ার ধান্দায় ‘খুচরা টাকা নেই‘ বলে ওরা সচারচর ছলনা করে। রিকসাওয়ালা যেন সকল কাজের কাজী! কত কাজের তাড়া তার! তাড়াতাড়ি দেন! ভাড়া না হলে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকে, আবার এখন তর সইছে না। এক শত টাকার নোটটা হাতে নিয়েই সাব জবাব- ‘স্যার, ভাংতি নেই। কী করি‘?

রিকসাওয়ালা নিজে কোথাও থেকে ভাংতি করে নিতে নারাজ। ভাবখানা এমন ফরহাদ সাহেব নোটটা পুরো দিয়েই চলে যাক আর কী! কিন্ত ফরহাদ হোসেন এক টাকাও বেশি দিতে রাজি নয়। আবার টাকা ভাংতিরও ঝামেলা। এখন উপায়? ইতিমধ্যে দু‘ এক কথা জোরে সোরেই হয়ে গেল তাদের মধ্যে। ফরহাদ সাহেব বলছেন টাকা ভাংতি করে নিতে, আর রিকসাওয়ালা তাগাদা করছে ভাংতি করে দিতে, নয় তো এক শত টাকায় দিয়ে যাও বাপু!

এমন পরিস্থিতিতে কোন সমাধানের পথ দেখছেন না ফরহাদ হোসেন। আবার রিকসাওয়ালা তাগাদা করছে‘ কী হলো স্যার, ভাংতি করে দেন। বেশিক্ষন দাঁড় করিয়ে রাখলে ভাড়া বেড়ে যাবে কিন্ত‘।

‘দাঁড় করিয়ে রাখলে ভাড়া বেড়ে যাবে‘ কথাটা শুনে ফরহাদ সাহেবের রাগ চরমে উঠে গেল। এমনিতেই রাতের বাসে ঢাকা এসে ঘুম হয়নি, গোসল-খাওয়াও ঠিক মত না হওয়ায় মেজাজ খিটমিট করছে। তার পর রিকসাওয়ালার চাপাবাজি! আরে ব্যাটা! ভাড়া নিবি তুই, আর টাকা ভাংতি করে দেব আমি! তোর কাছে কেন খুচরা টাকা থাকে না? আবার কী না বলে ‘দাঁড় করিয়ে রাখলে বেশি ভাড়া‘! এটা কী মগের মুল্লুক? অন্যদিকে রিকসাওয়ালাও কম ঝানু নয়, ভাংতি করে এনে ভাড়া দেন, ভাংতি ছাড়া রিকসায় উঠেছেন ক্যান? মহামুশকিল!

এমন সময় পাশ থেকে কে যেন সালাম ঠুকে দিলো অপ্রত্যাশিত ভাবে। ফরহাদ হোসেন ঘাড় ফিরে তাকাতেই যুবক ছেলেটি বলল ঃ কেমন আছেন স্যার?

ফরহাদ সাহেব অশ্চর্য্য হয়ে জানতে চায় ঃ তুমি কে বাবা? তোমাকে তো ঠিক চিনতে পারলাম না। চশমা খুলে পানজাবীর আঁচলে মুছতে থাকেন তিনি।

যুবক ছেলেটি চট করে উত্তর দেয়- আমাকে চিনতে পারছেন না স্যার? ফরহাদ সাহেব চশমা চোখে লাগিয়ে শাহিনের আপাদমস্তক প্রত্যক্ষ করতে থাকেন- স্মরণ করতে চেষ্টা করেন ছেলেটিকে কোথাও দেখেছিল কী না। হাঁ, মনে পড়েছে। শাহিন, তারই ছাত্র। মেধাবী ছাত্র ছিল। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শাহিন তার ছাত্র ছিল।

‘তা তুমি এখানে কী করছো বাবা‘? শাহিন উত্তর দেয়- উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার পর ঢাকায় চলে এসেছি। ভর্তি হয়েছি জগন্নাথ বিশ^বিদ্যালয়ে। পড়াশুনার ফাঁকে ৩/৪ ঘন্টা রিকসা চালায়। আগে টিউশানি করতাম, করোনার কারনে তা বন্দ হয়ে গেছে। বাধ্য হয়েই রিকসা চালায়। পড়ালেখার পাশাপাশি এখন নিজের খরচ চালিয়ে প্রতি মাসে ২/৩ হাজার টাকাও বাড়ীতে মায়ের কাছে পাঠায়। আপনি কোথায় যাবেন স্যার? আসুন। আমার রিকসায় পৌঁছে দিচ্ছি। বলেই শাহিন স্যারের হাত ধরে টানতে উদ্যত হয়।
ফরহাদ হোসেন বলেন, তুমি বাপু আগে এই শ‘টাকার নোটটা ভাংতি করে দাও। ওকে বিদায় করি। টাকা ভাংতি না থাকায় ৫০ টাকা ভাড়া দিতে পারছি না। কথা শেষ না হতেই শাহিন দুটো ৫০ টাকার নোট বের করে দেয়। চলে যায় রিকসাওয়ালা।
শাহিন জিজ্ঞেস করে- এবার বলুন স্যার, কোথায় যাবেন?

এখন আর কোথাও যাবো না। তা তোমার বাড়ীটা যেন কোথায়? ঠিক মনে করতে পাছি না। আর বয়সের ভারে সব স্মরণও থাকে না। অবসরকালীন টাকার জন্য শিক্ষা অধিদপ্তরে ঘুরতে ঘুরতে কাহিল হয়ে গেলাম।

স্যারের ঢাকা আগমনের হেতু জানতে শাহিনের আর অসুবিধা হয় না। সে জানায়, স্যার আমার নাম শাহিন। বাড়ী কেশবপুর। কুমারখালী শহরের দক্ষিণের গড়াই তীরের গ্রাম। বছর তিনেক হলো ঢাকায় এসেছি। বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তির প্রথম বছরেই বাবা মারা গেল। সংসারের আয়-রোজগার করার মত কেউ নেই। লেখাপড়া আর রিকসা চালানো আমার রুটিন। কারোর আর্থিক সাহায্য আমি পছন্দ করি না। টিউশানি গেলেও রিকসা এখন আমার আয়ের উৎস। বাড়ীতে ছোট একটা বোন আছে, ক্লাস সেভেনে পড়ে। মা ও বোনটির জন্য বাড়িতে প্রতি মাসে যে টাকা পাঠাই তাতেই চলে যায় কোন রকম। ভাবছি মাষ্টার্স শেষ করেই তারপর চাকরি বাকরির খোঁজ করবো। চলুন স্যার, আগে আমার মেসে চলুন।

বলতে বলতে শাহিন তার শ্রদ্ধের হাইস্কুল শিক্ষককে হাত ধরে রিকসায় বসিয়ে দেয়। ফরহাদ সাহেবের আপত্তি সত্বেও শাহিন মেসের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। শাহিনের পা দু‘টো নির্দিষ্ট তালে রিকসার প্যাডেলের সাথে কসরত করছে। মাঝে মধ্যে বেল বাজছে টুংটাং শব্দে। কখনো অনেকটা দাঁড়িয়ে আবার কখনো সিটে বসে রিকসা টানছে শাহিন। রিকসা টানতে যেন কোন কষ্টই অনুভূত হচ্ছেনা ওর। বেশ আনন্দই লাগছে একজন প্রিয় শিক্ষককে সে আপ্যায়নের জন্য মগবাজার থেকে রামপুরা নিয়ে চলেছে। নিজেকে ধন্য মনে করছে শাহিন। একাগ্রচিত্রে সে রিকসা টানছে।

রিকসায় বসে ষাটোর্ধ অবসর প্রাপ্ত শিক্ষক ফরহাদ হোসেন শাহিনের দিকে তাকিয়ে ভাবতে থাকেন। পিতৃহীন এই ছাত্রটি কতই না আত্মনির্ভশীল, ভবিষ্যতের কথা, জীবনের কথা, নিজের পায়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা ভেবে সে রিকসা চালাতেও কুন্ঠাবোধ করছে না। এই আদর্শবান শ্রমিক পড়–য়া ছাত্রটির মর্যাদাপূর্ন জীবন গড়ে তোলার জন্য যে আপ্রান চেষ্টা- সেটা একদিন অবশ্যই সফল হবে, এটা নিশ্চিৎ বলা যায়।

ফরহাদ সাহেব আরো ভাবেন, আমাদের ঘুনে ধরা সমাজের দরিদ্র অসহায় যুবকেরা যদি অন্যায় আর মাদকের নেশায় ডুবে না থেকে, দেশ জাতি সমাজ আর পরিবারের জন্য এমন কাজেও নিয়েজিত থাকতো- তাহলে কিছুতেই সমাজটা হতো না কলুষিত। ছাত্ররা পাশ করার জন্যই আজ ‘জীবনের উদ্দেশ্য‘ আর ‘জীবনের লক্ষ্য‘ রচনা পড়ে, পরীক্ষার খাতায়ও লেখে, কিন্ত বাস্তবতা উপলব্ধি করে না। শাহিনের মত এমন আদর্শে অনুপ্রাণিত হলেও বেকার যুবকেরা পরিবারের গলগ্রহ হতো না। করতো না পরগাছার মত অনিশ্চিত ঝুলন্ত জীবনযাপন। সমাজ ও সংসারে আসতো না দূঃখ দুর্দশা। কাজের প্রতি ঘৃনা না করে যদি সবাই কোন না কোন কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত করতো, তাহলে অবশ্যই থাকতো না অভাব-অনটন। পরিবারে নেমে আসতো শান্তির পরশ। সুখে দিন কাটতো সবার।

ঃ নামুন স্যার, এসে গেছি।
শাহিনের কথায় শিক্ষক ফরহাদ হোসেনের ভাবনায় ছেদ পড়ে। সম্বিৎ ফিরে আসে। শ্রমিক পড়–য়া ছাত্রের হাতটা ধরে নেমে পড়েন রিকসা থেকে। ধীর কদমে এগিয়ে যান শাহিনের রুমের দিকে।

বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।