ঢাকাSunday , 30 May 2021
  1. epaper
  2. অর্থনীতি
  3. আইন ও অপরাধ
  4. আন্তর্জাতিক
  5. ইতিহাস ঐতিহ্য
  6. ইসলামি দিগন্ত
  7. কুষ্টিয়ার সংবাদ
  8. কৃষি দিগন্ত
  9. খেলাধুলা
  10. গণমাধ্যম
  11. জনদূর্ভোগ
  12. জাতীয়
  13. জেলার খবর
  14. তথ্য প্রযুক্তি
  15. দিগন্ত এক্সক্লুসিভ

আবহমান সংস্কৃতির শেকড়ে বিশ্বায়নের কুঠারাঘাত

কে এম হিমেল
May 30, 2021 8:00 pm
Link Copied!

শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ জাতিগোষ্ঠী পৃথিবীর বুকে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হয়ে থাকে। আবহমান কাল থেকে মানুষ তার নিজস্ব জাতিসত্বার ভাষা ও সংস্কৃতি লালন করে আসছে পরম মমতায়। একটি জাতির আর্থ-সামাজিক পরিমন্ডলে সংস্কৃতির গুরুত্ব অপরিসীম। সংস্কৃতি প্রবহমান নদীর মতো- এর রূপান্তর আছে, মৃত্যু নেই মানুষের জীবনচর্চা ও চর্যার বৈচিত্র্যময় সমন্বিত রূপেই সংস্কৃতি। সামাজিক মানুষের জীবনযাপন পদ্ধতি,ধারাবাহিক ঐতিহ্য, প্রজন্মপরম্পরায় আচার-বিশ্বাস, ভূয়োদর্শন, শিল্পবোধের নিদর্শন, মনন-রুচি নীতি-নৈতিকতা এসবই সংস্কৃতির মৌল উপকরণ। সংস্কৃতি কেবল সাহিত্য শিল্পকলাকার বিষয়াদি নিয়ে সীমাবদ্ধ নয় বরং অর্থনীতি,রাজনীতি, ইত্যাদি সকল মানবিক ক্রিয়া- কলাপের সাথেই ওতোপ্রোতভাবে জরিত। অর্থাৎ মানুষ জাতিগতভাবে চলনে, বলনে, মননে যা কিছু আয়ত্ব করে এবং গভীর অনুশীলন ও পরিচর্যার মাধ্যমে যা কিছু জীবনের সাথে সম্পৃক্ত করে তাই হলো সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতির সাথে প্রকৃতি ও সমান বিবেকবোধ একীভূত রূপে থাকে বলে আমরা সংস্কৃতিবান জাতি বলতে সুখী জাতিকেই বুঝে থাকি। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির যুগে বিশ্বায়নের নামে এক নয়া সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসন চলছে। আকাশ-সংস্কৃতির এই যুগে পুঁজিবাদী শক্তি যেন তার অন্যতম পণ্য হিসেবে সংস্কৃতিকে বেঁছে নিয়েছে। তাই জাতীয় সংস্কৃতি বিলুপ্ত সাধনের মাধ্যমে মানুষ বেছে নিচ্ছে বাজার-সংস্কৃতি।
সুজলা সুফলা, শস্য -শ্যামলা বাংলার শান্তিপ্রিয় মানুষের প্রধান জীবিকা কৃষির উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে এর কৃষ্টি বা সংস্কৃতি। অথচ আজ সেসব লোকসংস্কৃতি ভুলে গিয়ে বাঙালি আজ পশ্চিমা অপসংস্কৃতির দিকে হাত বাড়িয়েছে। ফলে বাংলার সেই একান্নবর্তী পরিবার, সামাজিক বন্ধন শিথিল হয়ে পড়ায় সামাজিক অবক্ষয়ে নিমজ্জিত গোটা জাতি। মানুষ আজ ভাষা, ইতিহাস, নৈতিকতা, চিন্তা-চেতনা ও ঐতিহ্য সবকিছু বিসর্জন দিয়ে ধাবিত হচ্ছে অসুস্থ বিনোদনের দিকে। সুস্থ বিনোদনের দেশীয় অরণ্য উজাড় করে রোপণ করা হচ্ছে অপসংস্কৃতি বিষবৃক্ষ। হারিয়ে যাচ্ছে জারি,সারি, ভাটিয়ালি, গম্ভীরা, পুথি পাঠকের আসর, নৌকা বাইচ, হাডুডু,বৌছি খেলা, পিঠাপুলির নবান্ন। একে একে আমরা হারাতে বসেছি আবহমান সংস্কৃতির বিশাল ভান্ডার।
এরই সাথে সংস্কৃতির প্রধান  উপাদান ভাষার উপরেও এসেছে নগ্ন আগ্রাসন। বিকৃত ও প্রায় অশুদ্ধ বাংলা ব্যবহারে আমাদের জাতিগত দৈন্য আরও বেশি প্রকটভাবে প্রকাশিত হয়ে পড়ছে। টিভি-ইন্টারনেটের নির্বিচার ব্যবহারে আমাদের দেশের শিশু কিশোরদের মধ্যে নিজশ্ব সংস্কৃতি বলে আর কিছুই থাকছে না। এমনকি বাদ পড়ছে না যুবক,যুবতী,বৃদ্ধা। ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কেও হাল আমলের শিশু-কিশোরদের ধারণা একদম হতাশা ব্যাঞ্জক।
মুসলমানসহ এর পূর্বে এই বাংলায় যাদের আগমন ঘটছে সকলেই এই শস্য-শ্যামলা বাংলাকে আপন করে নিয়েছে এবং সংস্কৃতিকে আরও বেশি সমৃদ্ধ করে তুলেছে। অথচ ইংরেজ বণিক জাতি এই ভূখণ্ডকে কেবল এক বাজারের মতই ব্যবহার করছে এবং এখনো করে যাচ্ছে। একদিকে তারা এখানকার সম্পদ পাচার করেছে অন্যদিকে তাদের সংস্কৃতিসহ রেখে গেছে তাদের ভাবধারার সেবাদাস যারা আজও জাতীয় সম্পদ পাচার করেছে আর আমদানি করছে অসুস্থ বিনোদন আর মাদকদ্রব্য। কুলুষিত করছে গোটা সমাজ। তাই আজ পশ্চিমা সম্রাজ্যবাদী ধনতান্ত্রিক অর্থনীতির নতুন বাজারী পণ্য হচ্ছে অসুস্থ বিনোদন এবং এসব বিনোদনের ভয়ংকর সরঞ্জাম।
সোনালী ঊষার অবারিত মাঠের পানে দলবেঁধে যেত বাংলার কৃষক। পাড়া মুখরিত হয়ে উঠতো শিশু আর পাখির কলকাকলীতে। ঝি-বৌরা মেতে উঠতো নানাবিধ গৃহস্থালির কাজে। নদীর মতই শান্তি ছিল বহমান, ছিল সামাজিক বন্ধন। কারো দুঃখে সারা পাড়া নামতো শোকের আঁধার, তেমুনি এক বাড়ির আনন্দ-উৎসবে যোগদিত সারা গ্রাম। এক কথায় ছবির মতই সুন্দর ছিল গ্রাম আর গল্পের মতই মধুর ছিল মানবিক সম্পর্ক।
বিশ্বায়নের ফলে আমাদের সংস্কতিক অঙ্গনে তৈরি হচ্ছে এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি, ধনী দেশসমূহের অপসংস্কৃতির শিকার হচ্ছে গরীব দেশের যুবক শ্রেণি। বিশ্বায়নের ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের মতো আমাদের দেশেও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন সাধিত হচ্ছে। শুধু বাংলাদেশেই নয় তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহ অনেক ক্ষেত্রে অপসংস্কৃতির সম্মুখীন হচ্ছে। বৃহৎ শক্তি যে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে তাতে আমাদের সামাজিক সাংস্কৃতিক আবহাওয়া পাল্টে যাচ্ছে। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে ম্যাগাজিন, ভিডিও, সিডি, ইন্টারনেটের মাধ্যমে সহজলভ্যতা অপসংস্কৃতির বিস্তারকে আশঙ্কাজনকভাবে শক্তিশালী করে তুলছে। বিশেষত, এশীয় দেশগুলোর সুদীর্ঘ ঔপনিবেশিক ইতিহাস ও এ অঞ্চলকে পাশ্চাত্যের সাংস্কৃতিক পণ্য বিস্তারের উর্বর ভূমিতে পরিণত করেছে। সিনেমার পাশাপাশি পশ্চিমা সঙ্গীত ও এশিয়ায় ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। পশ্চিমা পপ-দলগুলোর বিশ্বসফর কর্মসূচিতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ভারত ক্রমবর্ধমান হারে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। স্হানীয় সংস্কৃতির উপর এগুলোর প্রভাব অনায়াসে লক্ষণীয়। সিনেমাগুলোতে সহিংসতা ও যৌনতার পরিমাণ বৃদ্ধি এবং সঙ্গীত রচনায় পশ্চিমা ঢং অনুকরণ এ অঞ্চলের দেশগুলোর অভিন্ন প্রবণতায় পরিণত হয়েছে। উপগ্রহ সম্প্রচার ব্যবস্থার  বিস্তার এই প্রক্রিয়াকে আরো বেগবান করেছে। উপগ্রহের মাধ্যমে প্রচারিত অনুষ্ঠানের বিষয়বস্তুুর সাথে স্হানীয় মূল্যবোধের প্রত্যক্ষ সংঘাত অনেক ক্ষেত্রেই লক্ষণীয়।
সুজলা সুফলা, শস্য-শ্যামলা অপরূপা সৌন্দর্য্যে ঘেরা এই বাংলাদেশ। এদেশের মানুষকে জীবন-যাপনও বৈচিত্র্যময়, বাংলার এই অপরূপ বৈচিত্র্যময় সৌন্দর্যের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কবি, লেখক, ও শিল্পিরা অনেক গান, কবিতা ও সাহিত্য রচনা করেছেন। যেমন জীবনানন্দ দাশ লিখেছেন-
এই পৃথিবীতে এক স্থান আছে- সবচেয়ে সুন্দর করুন;
সেখানে সবুজ ডাঙা ভরে আছে মধুকূপী ঘাসে অবিরল;
সেখানে গাছের নাম- কাঁঠাল,অশ্বণ্ড,বট, জারুল,হিজল,
সেখানে ভোরের মেঘে নাটার রঙের মতো জাগছে অরুণ ;
তথ্য প্রযুক্তি নির্ভর এই যুগে বাংলার সেই প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যময় সৌন্দর্য্যে দিন দিন বিলিন হয়ে যাচ্ছে। মানুষ বেছে নিচ্ছে বাজার-সংস্কৃতি। গ্রাম-গঞ্জেও দেখা যাচ্ছে নগরায়নের প্রভাব। ঘর বাড়ী তৈরি হচ্ছে পশ্চিমা দেশের আদলে। যানবাহনের উপরেও পড়ছে পশ্চিমা দেশের ছাপ।কলকারখানা, যানবাহন, ইলেকট্রিক মেশিনারি ইত্যাদি পরিবেশ দূষণ করছে। দিন দিন প্রকৃতি পড়ছে হুমকির মুখে।
বিশ্বায়নের এই যুগে বাংলার সাহিত্য, সংগীত,ললিত কলা, ক্রিয়া,মানবিকতা,কর্ম পদ্ধতি, জীবন-যাপন, জ্ঞানের উৎকর্ষতা ইত্যাদি ধরণ পাল্টে যাচ্ছে ও কিছু হারিয়ে যাওয়ার পথে। বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় খেলাধুলা- কাবাডি, কানামাছি, লাঠি খেলা, বউচি, গোল্লাছুট,ষাঁড়ের লড়াই, নৌকা বাইচ,ওপেন টু বায়স্কোপ, পুতুল খেলা ইত্যাদি এখন আর তেমন দেখাই যায় না। চালের গুড়ি তৈরী, বিবাহ, হালখাতা, চাষ, ও অনন্য কর্মপদ্ধতিতে পড়েছে পশ্চিমা দেশের অপসংস্কৃতির প্রভাব। মানুষ পরিনত হচ্ছে যন্ত্র মানবে।
বিশ্বায়নের ফলে নারী পুরুষ পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও স্বাভাবিক সম্পর্ক আর টিকে থাকচে না। মানবিক মূল্যবোধ ভেঙে যান্ত্রিক রূপ নিচ্ছে। প্রবৃত্তি আর যন্ত্রের কাছে হরে যাচ্ছে মানুষ। বিশ্বায়ন যে বাজারি-সংস্কৃতি তৈরি করছে, সেই সংস্কৃতিতে ব্যক্তির পরিচয় থাকে না। তাই আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতি যথাযথ সমুন্নত রাখতে সম্মিলিত প্রয়াস চালাতে হবে।
শাহিন আলম 
গণ যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় রংপুর। 

বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।