শুক্রবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২২, ১১:২৩ অপরাহ্ন

আবারও আলোচনায় ‘জাতীয় সরকার’

নিজস্ব প্রতিনিধি / ২৪ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
আপডেট টাইম : রবিবার, ৯ জানুয়ারী, ২০২২, ১:৪১ পূর্বাহ্ন

সালমান তারেক শাকিল

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আবারও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো ‘জাতীয় সরকার’ প্রশ্নে সক্রিয় হয়েছে। প্রক্রিয়াটিকে একটি ‘ইস্যু’ হিসেবে দাঁড় করাতে চাইছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরে অন্যান্য রাজনৈতিক দল। এখন পর্যন্ত উদ্যোগটি প্রাথমিক পর্যায়ে এবং বিক্ষিপ্তভাবে আলোচিত হচ্ছে।

উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, মানুষ সরকারবিরোধী আন্দোলনের জন্য আগ্রহ না দেখালেও অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিকভাবে দেশের পরিস্থিতি অনেক জটিল বলে মনে করছেন। বিশেষত, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও এর প্রভাব সম্পর্কে রাজনীতিকরা স্পষ্ট ধারণা না পেলেও তারা পরবর্তী পরিস্থিতি জানতে উদগ্রীব।

জাতীয় সরকারের ফর্মুলাটি আলোচনায় আসে মূলত ওয়ান-ইলেভেনের সময়। এরপর ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগেও ফর্মুলাটি আলোচিত হয়। যদিও দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীনে হওয়ায় তখন এ আলোচনা ছিল অনেকটা ক্ষীণ। এরপর গত এক বছর ধরে ড. কামাল হোসেন, আ স ম আব্দুর রব, অলি আহমদ, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, মাহমুদুর রহমান মান্না, সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, জোনায়েদ সাকিসহ তরুণ কয়েকজন রাজনীতিক বিভিন্ন সভা-সেমিনারে ‘জাতীয় সরকার’ পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করছেন। শনিবার (৮ জানুয়ারি) জাতীয় সরকারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচি দিয়েছে আ স ম রবের নেতৃত্বাধীন জেএসডি।

বিভিন্ন দলের নেতারাবিভিন্ন দলের নেতারা
গত কয়েক দিনে ‘জাতীয় সরকার’ বিষয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও সুশীল সমাজের বিশিষ্টজনদের সঙ্গে বাংলা ট্রিবিউনের এ প্রতিবেদকের আলাপ হয়। তারা মনে করেন, আগামী নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীনে করার চেষ্টা হলেও তাতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসবে না। পাশাপাশি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পক্ষে শক্ত অবস্থান নিলে ক্ষমতাসীন দলের ‘এক্সিট-পয়েন্ট’ বিবেচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়াতে পারে। সে ক্ষেত্রে সাংবিধানিকভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হয়ে যাওয়ায় একমাত্র পথ—সমঝোতাভিত্তিক সরকার। যেটিকে তারা ‘জাতীয় সরকার’ বলে আখ্যায়িত করতে চাচ্ছেন।

জাতীয় সরকারের উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত একটি দলের প্রধান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, যেহেতু ক্ষমতা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হবে না, আর একইসঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের অল্টারনেটিভ বিএনপির ব্যাপারেও প্রশ্ন আছে, সেই পরিপ্রেক্ষিতে গণতন্ত্র বা নির্বাচনের পথ সুগম করতে মধ্যবর্তী ব্যবস্থা হচ্ছে ‘জাতীয় সরকার’। জাতীয় সরকার হলে সবাই আসবে।

তিনি জানান, জাতীয় সরকারে সব দলের অংশগ্রহণ থাকবে। একইসঙ্গে সমাজের পেশাজীবী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিত্বও থাকবে।

একজন বিশিষ্ট নাগরিক বলছেন, পরিস্থিতি দিনে দিনে অস্বাভাবিক পর্যায়ে যাচ্ছে। কেবল নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা বদল বা তত্ত্বাধায়ক পদ্ধতি প্রবর্তন হলেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে না। এক্ষেত্রে নির্বাচনি প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী করার বিষয় রয়েছে। এসব কিছু ঐকমত্যের মাধ্যমেই সম্ভব।

একাধিক রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ‘জাতীয় সরকার’ ইস্যুতে ইতোমধ্যে নাগরিক ঐক্য, গণসংহতি আন্দোলন, মওলানা ভাসানী অনুসারী পরিষদ, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন আলোচনা করছে। দুই দফায় বৈঠকও করেছেন সংগঠনগুলোর শীর্ষ নেতারা। এই প্রক্রিয়ায় জেএসডি, গণ-অধিকার পরিষদসহ অন্যান্য সংগঠনও যুক্ত হতে পারে। তবে আলোচনাগুলো এখনও প্রাথমিক অবস্থায় রয়েছে। পাশাপাশি কারও কারও এই প্রস্তাব নিয়ে মতপার্থক্যও তৈরি হয়েছে।

জেএসডির ‘জাতীয় সরকার’ প্রস্তাবনায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাজেএসডির ‘জাতীয় সরকার’ প্রস্তাবনায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা
‘জাতীয় সরকার’ নিয়ে সক্রিয়দের মধ্যে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী অন্যতম। সম্ভাব্য ঐকমত্যের সরকারে তিনি আওয়ামী লীগ-বিএনপিসহ রাজনৈতিক সমঝোতা চান। এই সরকারে তিনি বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ রেহানার নাম প্রস্তাব করেছেন আগ্রহী নেতাদের কাছে। আর এ বিষয়টি নিয়ে অনেক নেতার মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। যদিও জাফরুল্লাহ চৌধুরী এই মতবিরোধ নিরসনে কাজ করছেন বলে জানান তার এক ঘনিষ্ঠজন।

দুই বছরের জন্য জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব রেখে জাফরুল্লাহ চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই বছরে দুই দলের, অর্থাৎ আওয়ামী লীগের দুজন থাকলো, বিএনপির দুজন থাকলো, অন্যদের একজন করে থাকলো, বুদ্ধিজীবী থাকলো, আইনজীবী থাকলো, এদের দিয়ে জাতীয় সরকার হবে।’

নাগরিক সমাজের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ‘জাতীয় সরকার’ ব্যবস্থা নিয়ে সিভিল সোসাইটিতে তেমন কোনও উদ্যোগ লক্ষ করা যাচ্ছে না। বিশেষত এখন আন্তর্জাতিক পক্ষগুলো এ অবস্থায় ‘রোল প্লে’ করেনি বলে সিভিল সোসাইটি থেকেও কোনও ‘রা’ উঠছে না। তবে আমেরিকান স্যাংশনের কারণে দেশের ধণিক শ্রেণির মধ্যে ‍দুশ্চিন্তা শুরু হয়েছে এবং ধনিকদের যারা সরকারের সঙ্গে যুক্ত—তারাও পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হতে চাইছে।

নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নার ভাষ্য—ঐক্য হচ্ছে বাস্তব প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে ঐক্য দরকার। সেটা একমঞ্চ হোক বা যুগপৎ হোক। পরিবর্তন হতেই হবে, সে পরিবর্তন ইতিবাচক হতে পারে।’

জানতে চাইলে গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি বলেন, ‘মূল কথা হচ্ছে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে কোনও নির্বাচন হবে না। এজন্য সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে সরকারকে পদত্যাগ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের হাতে ক্ষমতা ন্যস্ত করতে হবে। সব রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে এই সরকার গঠিত হবে। এটিকে কী নামে ডাকা হবে, সেটি বিবেচ্য না।’

‘জাতীয় সরকার’-এর বাস্তবতা সম্পর্কে জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক অধ্যাপক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘‘দেশে এখন রাজনৈতিক সমঝোতা দরকার। নির্বাচনি প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে গেছে। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে। এ অবস্থায় রাজনৈতিক সমঝোতার কোনও বিকল্প নেই। আমরা একটা চরম সংকটের মধ্যে আছি, এই সংকট থেকে বের হতে হলে ঐকমত্যের ভিত্তিতে ‘জাতীয় সরকার’ হতে পারে। এতে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতাবদল সম্ভব।’’

এলডিপির একটি সভায় অলি আহমদএলডিপির একটি সভায় অলি আহমদ
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন ও নাগরিক সমাজের কেউ কেউ ‘জাতীয় সরকার’ গঠনের প্রস্তাব দিলেও বিএনপির পক্ষে বিষয়টিতে যুক্ত হওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই। বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বলেন, ‘কোনও দিকে খেলা হচ্ছে। রেসপেক্টফুলি ওয়েআউট দেওয়ার জন্য এই প্রসেস শুরু হতে পারে। সরকারের মধ্যে কোনও মেশিনারিজ এটা করাচ্ছে, বোধকরি। এর সঙ্গে বিএনপি নেই।’

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ‘বিএনপি সংগ্রাম করছে দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য। দেশে নিরপেক্ষ নির্বাচন, নিরপেক্ষ প্রশাসন ফেরানোর সংগ্রাম করছে বিএনপি। দেশের জনগণের মূল দাবি হচ্ছে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার।’ এ কারণে জনগণের নজর অন্যদিকে নিয়ে যাওয়ার কোনও প্রচেষ্টায় বিএনপি নেই বলে উল্লেখ করেন ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।

২০১৯ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ‘জাতীয় সরকার’র দাবিতে গণফোরামের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ড. রেজা কিবরিয়ার সই করা বিবৃতি দেয় জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। সেই বিবৃতিতে তিনটি দাবি জানানো হয়েছিল। সেই দাবিগুলোর মধ্যে ‘বর্তমান সরকারকে পদত্যাগ করে জাতীয় সরকার ঘোষণা করা এবং খালেদা জিয়ার মুক্তি’র বিষয়টি ছিল উল্লেখযোগ্য।

জাতীয় সরকার ইস্যুতে বিএনপির সায় না থাকা প্রসঙ্গে বিশিষ্ট একজন নাগরিকের ভাষ্য, এই পদ্ধতি বিএনপির সেকেন্ড বেস্ট। এখন তারা এলেও কর্তৃত্ববাদী শাসনই করবে। বিএনপিকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর ....

এক ক্লিকে বিভাগের খবর